গত দেড় মাস ধরে দলের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদের। আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে বাইরে। তার অনুপস্থিতিতে সভা-সমাবেশসহ দলীয় সব কাজ চলছে মহাসচিবের নেতৃত্বে। কিন্তু কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না দল। জিএম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না, তা এখন নির্ভর করবে জজ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
পার্টি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জিএম কাদের নিম্ন আদালতে যে আপিল করেছিলেন, আগামী ৯ জানুয়ারির মধ্যে তা নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আর ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া ওই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছিল, সর্বোচ্চ আদালত তা বাতিল করে দিয়েছে। গতকাল বুধবার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত নেতা ও দলের সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা যে আবেদন করেছিলেন, তার নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেয়। সর্বোচ্চ আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে জিএম কাদের আপাতত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে দুপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জাপা চেয়ারম্যানের ওপর এ নিষেধাজ্ঞায় শঙ্কিত দলের নেতাকর্মীরা। তারা মনে করছেন, এতে করে দেশের বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারছে না দলটি।
অবশ্য চেয়ারম্যানের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞায় দলের কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান আছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সম্মেলন করছি, কমিটি করছি। সংগঠন চলছে। চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটা করতে পারছি না। এই মুহূর্তে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত লাগবে, তেমন কিছু নেই। যেমন রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহাসচিব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাচন বোর্ড করা আছে। রুলসে আছে, চেয়ারম্যান বা মহাসচিব যেকোনো একজন প্রতীক বরাদ্দ দিতে পারবেন। কোনো অসুবিধা হবে না। উপনির্বাচনেও কোনো সমস্যা হবে না। মনোনয়নের ক্ষেত্রে মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে তৃণমূল থেকে। সিদ্ধান্ত নেবে নমিনেশন বোর্ড। প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেবেন চেয়ারম্যান অথবা মহাসচিব। সেখানে কোনো সমস্যা নেই।’
তবে এ নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের রাজনীতিতে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কোর্টের প্রতি সম্মান জানাই সবসময়। কিন্তু সরকার তার অবস্থান থেকে যদি সরে না আসে, তাহলে আমাদের দলকে প্রধান বিরোধী দলের কথা বললেও সেখানে থাকতে পারবে না। এতে দেশে আরও রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এখন রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কে শক্তভাবে কথা বলবে? যে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের চেয়ারম্যান, তার কার্যক্রমই তো স্থগিত করা হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি না খেলাটা কী?’
গতকাল আপিল বিভাগে জিএম কাদেরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। জিয়াউল হক মৃধার পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ। আদেশের পর সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘হাইকোর্ট রুলসহ যে আদেশ দিয়েছিল, তা বাতিল করেছে আপিল বিভাগ। ফলে জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করতে পারবেন না।’
অন্যদিকে জিএম কাদেরের আইনজীবী শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জিয়াউল হক মৃধার করা আবেদন নিষ্পত্তি করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। জেলা জজ আদালতে জিএম কাদেরের করা আপিলটি ৯ জানুয়ারি শুনানি করতে বলেছে। ফলে জিএম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না তা জানতে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
জাপা চেয়ারম্যানের ওপর নিষেধাজ্ঞার পেছনে সরকারের হাত থাকতে পারে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। এ ব্যাপারে আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, ‘সরকারের উচিত এ স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া। সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে না বলেই কোর্ট আমাদের ব্যাপারে নেতিবাচক। কারণ এখানে অ্যাটর্নি জেনারেল থাকেন, সরকারের পক্ষে লোকজন থাকেন। সরকার যদি স্বচ্ছ থাকে, জিএম কাদেরের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্তের সমাধান চলে আসে। সরকার চাইছে না, তাই হচ্ছে না। রওশন এরশাদ, জিএম কাদের ও সাদ এরশাদ গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। তারপর আবার রায় এলো। এখন নিজেদের অচল মনে হচ্ছে।’
আদালতের এমন নিষেধাজ্ঞায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যানকে সিভিল কোর্টের কোনো মামলায় কোর্ট তার কার্যক্রম স্থগিত করে রাখবেন, এরকম কোনো নজির বাংলাদেশে আছে বলে আমার জানা নেই। এখানে দলের গঠনতন্ত্রের একটি ধারা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। কোর্ট সেই ধারা স্থগিত করতে পারেন। কোর্ট সেটা না করে তার চেয়ে বেশি দিয়েছেন। কী করে এমন রায় দিলেন, সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। কোর্ট দিয়েছে, কিছু করার নেই। তবে আমরা মনে করি, এতে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। জনগণের পক্ষে যে ব্যক্তি কথা বলতেন, বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের স্বার্থে কথা বলতেন, সেটা বলতে পারছেন না। জনগণ বঞ্চিত হচ্ছেন।’
অবশ্য এসব মামলা-মোকদ্দমার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির গুরুত্ব প্রকাশ পাচ্ছে বলে মনে করেন জাপা মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন এলেই জাতীয় পার্টির ওপর কিছু সংকট তৈরি হয়। আমার মনে হয় কোনো পার্টি মনে করে না এককভাবে কোনো দল ক্ষমতায় যেতে পারবে। সে কারণে তারা জাপাকে সঙ্গে চায়। জাপা দুই দলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিএনপি চায় জাতীয় পার্টি তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যাক, সংসদ থেকে পদত্যাগ করুক। আবার সরকারি দলও চাইতে পারে।’