বিএনপির নিখোঁজ নেতার বাসায় হাস, ক্ষুব্ধ আ.লীগ

নয় বছর আগে নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বাসায় গিয়ে ফেরার সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। গতকাল বুধবার সকালে সুমনের নাখালপাড়ার বাসা থেকে বেরোনোর সময় পিটার হাসকে ঘিরে ধরেন ‘মায়ের কান্না’ নামে সংগঠনের সদস্যরা। বিষয়টি নিয়ে পিটার হাস বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। তবে সরকারকে না জানিয়ে রাষ্ট্রদূতের এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ১৪ ডিসেম্বর স্মরণ করছে। আপনি বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে না গিয়ে চলে গেছেন সুমনের বাড়িতে।’

জানা গেছে, নিখোঁজ সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি ‘গুমের’ শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাকের’ আহ্বায়ক। গতকাল সকাল ৯টার দিকে পিটার হাস তুলিদের বাসায় যান। সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থান করেন। বিভিন্ন সময়ে ‘গুম’ হওয়া কয়েকজনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি সুমনের বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ‘মায়ের কান্না’ সংগঠনের সদস্যদের সামনে পড়েন।

সানজিদা ইসলাম তুলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছি। সরকারের কাছে বারবার গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান দাবি করে আসছি। কিন্তু সরকার কিছু করছে না; বরং সম্প্রতি বিভিন্ন মহল থেকে হুমকি বেড়েছে।’ রাষ্ট্রদূত কী বলেছেন জানতে চাইলে তুলি বলেন,‘আলোচনার বিষয় বাইরে বলতে চাই না।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শাহীনবাগে একটি পরিবারের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সাক্ষাৎ করতে গেছেন, এমন খবরে বাড়ির সামনে জড়ো হন ১৯৭৭ সালে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর সদস্যদের সন্তান ও চাকরিচ্যুত সদস্যরা। সাক্ষাৎ শেষে রাষ্ট্রদূত বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ঘিরে ধরে ৪৫ বছর আগের গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্ত চান তারা।

সুমনের বাসায় গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। গতকাল সন্ধ্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আজকে (গতকাল) হঠাৎ করে জরুরি ভিত্তিতে আমার সঙ্গে দেখা করেন। আমার সঙ্গে দেখা করে আমাকে উনি বললেন, উনি একটি বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে অনেক লোক ছিল। উনি গিয়েছিলেন একটি বাসায়। কিন্তু বাইরে অনেক লোক ছিল। তারা ওনাকে একটা কিছু বলতে চাচ্ছিল। ওনার সিকিউরিটির লোকরা ওনাকে বলেছেন, আপনি তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যান। এই লোকরা আপনার গাড়ি ব্লক করে দেবে। তিনি তখন তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে যান। এ ঘটনায় উনি খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছেন।’

মোমেন বলেন, ‘আমি ওনাকে বললাম, আপনার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদের। আপনার ওপর বা আপনার লোকদের ওপর কেউ আক্রমণ করেছে?’ উনি বললেন, ‘না।’ তবে ওনার গাড়িতে হয়তো দাগ লেগেছে। তবে উনি শিওর না। আমি বললাম, ‘আপনার এবং আপনার লোকজনকে আমরা নিরাপত্তা দেব। আপনি আরও অধিকতর নিরাপত্তা চান, আমরা দেব। তবে আপনি যে ওখানে গেছেন, এ খবরটা কে প্রকাশ করল, আমরা তো জানি না। আমরা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছুই জানি না। আপনারা আমাদের কিছুই জানানওনি। আপনি ওখানে যাবেন, এ তথ্যটা লিক করল কে। উনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।’

মোমেন বলেন, ‘আমি তাকে আবার বলেছি, আপনার নিরাপত্তা দেব। কিন্তু আপনি বের করেন আপনার যাওয়ার খবরটা কে বের করল। উনি দুশ্চিন্তায় আছেন।’

এদিকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বাড়িতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি ভালোভাবে নেয়নি সরকার। রাষ্ট্রদূত কেন বিএনপি নেতার বাসায় গেলেন, সে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আমি সবিনয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে কতজন গুম হয়, সে চিত্রটা কিন্তু আমরা সিএনএনে শুনেছি। কতজন ধর্ষিত হয় নারী, সেটাও আমরা দেখেছি। কতজন খুন হয়, সে চিত্রও আমরা দেখেছি। আপনি পিটার হাস সাহেব, আপনি বাংলাদেশে ১৪ ডিসেম্বর স্মরণ করছেন। যদি দেখতাম আপনি বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গেছেন, সে চিত্রটা বেশি ভালো লাগত। তার আগেই উনি চলে গেছেন সুমনের বাড়িতে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে গুম করেছে, খুন করেছে।’ ওবায়দুল কাদের দাবি করেন, ‘মামলা থেকে রক্ষা পেতে বিএনপির অনেকেই নিজে থেকে নিখোঁজ রয়েছে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের জানা উচিত।’