শীতের খাদ্যাভ্যাস

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপনে যে রকম পরিবর্তন হয়, তেমনি পরিবর্তন হয় খাদ্যাভ্যাসে। শীতে শরীরের রোগ প্রতিরোধক এনজাইম কাজ করে কম। ফলে রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা কমে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পুরো শীতকাল রঙিন শাকসবজি আর ফলমূলে ভরপুর থাকে। শাকসবজি আর ফলমূলের প্রধান উপাদান ভিটামিন ও মিনারেল। ভিটামিন ও মিনারেলস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বাড়ায়, তেমনি শরীরে শর্করা, আমিষ ও চর্বির ব্যবহারে সাহায্য করে। শীতে সুস্থ থাকতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস জরুরি। শীতে কী খাবেন, কেন খাবেন জানালেন মানবিক সাহায্য সংস্থার  পুষ্টি কর্মকর্তা নাজিয়া আফরিন

শাকসবজি

অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীতকালের শাকসবজি এবং ফলের স্বাদ ও পুষ্টি গুণাগুণও বেশি হয়ে থাকে। এ সময় বাজারে পাওয়া যায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, লালশাক, পালংশাক, মুলা, শালগম, শিম, টমেটো, পেঁয়াজপাতা, লাউ, ব্রোকলি, মটরশুঁটি, গাজর, ধনেপাতা, লাউ ইত্যাদি। এসবে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, বিটা-ক্যারোটিন, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, আঁশ ও ভিটামিন রয়েছে। অস্থিক্ষয় রোধে ও শরীরে রক্তকণিকা বা প্লাটিলেট গঠনে ভূমিকা রাখে। ভিটামিন-সি, এ এবং ই-এর ঘাটতি পূরণ করে এসব ফল ও শাকসবজি। এতে আছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন-ই; যা ওজন কমানোর পাশাপাশি চুল পড়াও কমায়।

ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রায় সবারই পছন্দ। ফুলকপিতে রয়েছে ভিটামিন-‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ক্যালসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড ও পানি। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার রয়েছে। ফুলকপিতে এমন কিছু উপাদান আছে, যা কিডনির পাথর ও ক্যানসার নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। ফুলকপিতে চর্বি নেই। ফুলকপি তাই কোলেস্টেরলমুক্ত, যা শরীরের বৃদ্ধিতে বিশেষ উপযোগী। পাশাপাশি বাঁধাকপিতে আছে ভিটামিন-সি ও ফাইবার। শরীরের হাড় শক্ত ও মজবুত রাখতে এবং ওজন কমাতে বাঁধাকপির জুড়ি নেই। বাঁধাকপি আলসার প্রতিরোধে কাজ করে। আরেক সবজি ব্রোকলিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ক্যালসিয়াম আছে। ব্রোকলি উপাদেয়, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সবজি। রাতকানা, অস্থি বিকৃতি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে।

গাজর পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও খাদ্য আঁশসমৃদ্ধ শীতকালীন সবজি, সারা বছরই পাওয়া যায়। তরকারি বা সালাদ দুভাবেই খাওয়া হয়। গাজরে আছে বিটা ক্যারোটিন, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। অন্য উপাদানগুলো অন্ত্রের ক্যানসার প্রতিরোধ ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। গাজরে উপস্থিত ক্যারোটিনয়েড ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। ত্বকের খসখসে ও রোদে পোড়া ভাব দূর করে। জলপাইয়ে আছে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’, ‘ই’, লৌহ ও অসম্পৃক্ত চর্বি। স্থূলতা কমানোর পাশাপাশি শরীরে উপকারী চর্বি বাড়ায়। বাতের ব্যথা, হাঁপানি উপশমে জলপাই ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া টকজাতীয় এ ফলে আছে ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ‘ই’। এ ভিটামিনগুলো দেহের রোগজীবাণু ধ্বংস করে, উচ্চরক্তচাপ কমায়, রক্তে চর্বি জমে যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস করে হৃৎপি-ের রক্তপ্রবাহ ভালো রাখে।

ধনেপাতা সরাসরি সালাদ হিসেবে ও রান্না করে দুভাবেই খাওয়া যায়। এতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’, ‘এ’, ‘ক’ ও ফলিক অ্যাসিড রয়েছে, যা আমাদের ত্বকের প্রয়োজন। ধনেপাতার ভিটামিন আমাদের ত্বকে প্রতিদিনের পুষ্টি জোগায়, চুলের ক্ষয়রোধ, হাড়ের ভঙ্গুরতা দূর এবং মুখের ভেতরের নরম অংশগুলোকে রক্ষা করে। ক্যালরিতে ভরপুর টমেটোতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, যা দেহের হাড় ও দাঁত গঠনে সাহায্য করে। তা ছাড়া ভিটামিন-সি-এর অভাবজনিত স্কার্ভি ও চর্মরোগ প্রতিরোধে টমেটো বেশ কার্যকর। টমেটোতে থাকা লাইকোপেন ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। টমেটোতে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা প্রকৃতির আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির বিরুদ্ধে কাজ করে।

শীতের সবজি মটরশুঁটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি। এটা উদ্ভিজ্জ আমিষের বড় উৎস। শিমে আমিষ ছাড়া স্নেহ ও ফাইবার থাকে। শিমের আঁশ খাবার পরিপাক ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরে সহায়তা করে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করে পাকস্থলী ও প্লিহার শক্তি বাড়ায়। লিউকোরিয়াসহ মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন সমস্যাও শিশুদের অপুষ্টি দূর করে।

শীতের শাক পালং। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড। পালংশাক আমাদের শরীরে

আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস ছাড়াও হৃদরোগ ও কোলন ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। শীতের আরেক পরিচিত সবজি হলো মুলা। বিভিন্ন ক্যানসার, কিডনি ও পিত্তথলিতে পাথর তৈরি প্রতিরোধে সাহায্য করে। এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। শরীরের ওজন হ্রাস , আলসার ও বদহজম দূর করে।  লাউ খেলে ত্বকের আর্দ্রতা ঠিক থাকে। কিডনির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা যাদের তাদের জন্য আদর্শ সবজি। নিদ্রাহীনতা দূর এবং ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস, যা দেহের ঘামজনিত লবণের ঘাটতি কমায়। দাঁত ও হাড়কে মজবুত করে। লাউ কোষ্ঠকাঠিন্য, অর্শ, পেটফাঁপা প্রতিরোধের ওষুধ।

ফলমূল

শীত মৌসুমে বাজারে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন জাতের কুল বা বরই, কমলালেবু, আমলকী, আপেল, সফেদা, ডালিম ইত্যাদি পাওয়া যায়। এসব ফলে আছে ভিটামিন ‘সি’ ও ‘এ’, মিনারেল, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ‘ই’, অ্যান্টিঅক্সিজেন, ফাইবার। এসব মৌসুমি ফল শুধু মুখরোচকই নয়, এতে থাকা নানা ভিটামিন এবং মিনারেলস দাঁত, মাড়ি মজবুত করতে যেমন সাহায্য করে, তেমনি নানা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এসব ফল ও শাকসবজি সুস্থতার পাশাপাশি সজীবতা, সৌন্দর্য ও তারুণ্য ধরে রাখে। শরীরে আঁশের ঘাটতি মেটাতে ও ভিটামিন ‘সি’র জোগান দিতে শীতের সময় বেশি করে টকজাতীয় ফল খাওয়া ভালো।

পানি ও তরলজাতীয় খাবার

শীতের কারণে অনেকেই কম পানি পান করে। এর ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে যায়। তাই শীতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, তরলজাতীয় খাবার, স্যুপ, গরম ডাল, মিক্সড ফলের জুসএ ধরনের খাবার গ্রহণ করলে শরীর পানিশূন্য হবে না। ত্বক ও চুল সতেজ থাকবে। ঠোঁট ফাটবে না। শীতকালীন সময়ের সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে সবাই সুস্থ ও সুন্দর থাকুন। উপভোগ করুন তাজা শাক সবজি ও ফলমূল।

মডেল : মৌ, অ্যামি ও সামিয়া

মৌ-এর ছবি তুলেছেন আবুল কালাম আজাদ