মেসি উন্মাদনায় সুফল আসছে কূটনীতিতে

বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও মেসিকে নিয়ে উন্মাদনার সুফল আসছে কূটনৈতিক সম্পর্কে। প্রায় ৪৪ বছর পর বাংলাদেশে আবারও দূতাবাস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এই প্রক্রিয়ায় আর্জেন্টিনায়ও খোলা হতে পারে বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলার অফিস।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশে দেশটির লাখ লাখ ভক্ত-সমর্থকের কারণেই কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরালো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকার এ দেশটির নাগরিকদের বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উচ্ছ্বাস ও বাংলাদেশিদের শুভেচ্ছা জানানোর খবর এসেছে বিশ্ব গণমাধ্যমে।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল এই দুই দেশকে এতটা কাছাকাছি এনেছে, এটা অনেক বড় একটি ঘটনা। বাংলাদেশে পুনরায় আর্জেন্টিনার মিশন খোলার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।’

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই লাতিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে দেশজুড়ে উন্মাদনা। অন্য দলের সমর্থক থাকলেও এ দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল বাগ্্যুদ্ধ এবং কখনো কখনো সংঘর্ষও বেধে যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে ব্রাজিলের সমর্থক বেশি দেখা গেলেও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে, অর্থাৎ ফুটবলের কিংবদন্তি তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার আগমনে আর্জেন্টিনার সমর্থকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় লা আলবিসেলেস্তেদের আরেক তারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে গত চারটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উন্মাদনা দেখছে বিশ্ব।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে নগরীর বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে এখন আর্জেন্টিনার পতাকা। পুরো দেশ যেন মেসিময়। সারা দেশে আর্জেন্টিনা দলের জার্সি বিক্রির হিড়িক। আর এই উন্মাদনার খবর বিশ্ব মিডিয়া ও আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে পৌঁছে গেছে আর্জেন্টাইনদের কাছে। মেসি ও দলের প্রতি বিপুল এ সমর্থনে খুশি আর্জেন্টিনার সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে এই উন্মাদনার খবরে আর্জেন্টাইনরাও খুশি। কাতার ফুটবল বিশ্বকাপের মধ্যেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচে টাইগারদের জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে তারা। একই সঙ্গে ফুটবল কূটনীতির স্মারক হিসেবে বাংলদেশে আবারও মিশন খোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে আর্জেন্টিনা সরকার। ফুটবল জাদুকর মেসিকেও বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে লাখো ভক্ত ও সমর্থকের কথা আর্জেন্টাইনরাও জানে। এর প্রমাণ হলো এবার বিশ্বকাপ চলাকালেই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন লিওনেল মেসির হাতে ভার্চ্যুয়ালি বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তারা বাংলাদেশি ভক্তদের আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে মিছিলের কয়েকটি ছবিও পোস্ট করেছে; সেই খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে। আবার আর্জেন্টিনার দোকানপাটে বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি হচ্ছে এবং দেশটির রাস্তাঘাটে ও বাড়িতে বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা শোভা পাচ্ছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোতে মেসি ও আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে টক শো হচ্ছে। একইভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করে আর্জেন্টিনার টেলিভিশনের টক শোতেও আলোচনা চলছে। এ কারণেই দুই দেশের দূরত্ব আরও কমছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে আর্জেন্টিনার একটি কূটনৈতিক মিশন ছিল। ১৯৭৮ সালে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে ভারতের দিল্লির আর্জেন্টিনা দূতাবাস থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে কাজগুলো হয়। ১৯৯২ সালে সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আর্জেন্টিনার সঙ্গে কূটনৈতিক কাজগুলো করা হয়। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ চলার মাঝেই আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো ক্যাফিয়েরো জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা বাংলাদেশে আবারও দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, চলতি বছরের আগস্টে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ চুক্তির পক্ষে দশম পর্যালোচনা সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিষয়াদি নিয়ে তার বৈঠক হয়েছে।

এদিকে ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও আর্জেন্টিনার অনাবাসী রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বরত সাদিয়া ফয়জুন্নেসা জানিয়েছেন, মেসিকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে তারা একটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করতে চান। তিনি বলেন, ‘মেসি বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। বাংলাদেশের মানুষ আর্জেন্টিনা ও মেসিকে ভালোবাসে। তিনি বাংলাদেশে এলে আমরা সম্মানিত বোধ করব।’

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে এসেছিলেন লিওনেল মেসি। সে সময় নাইজেরিয়ার সঙ্গে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচে খেলেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক : বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনায় কূটনৈতিক মিশন না থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য থেমে নেই। ২০২১ সালে আর্জেন্টিনা থেকে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ মূলত ভোজ্য তেল, তেলবীজ ও শস্য আমদানি করে থাকে। বিপরীতে বাংলাদেশও আর্জেন্টিনায় তৈরি পোশাক, জুতা, খেলনা ইত্যাদি রপ্তানি করে থাকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে আর্জেন্টিনায় ৬৮ লাখ ৫৪ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।

এদিকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জেন্টিনার বিখ্যাত লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তার কথা ভোলেনি বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার’ দেওয়া হয়।