যে কোনো সমাজে বসবাস করাই একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। নিজ, পরিবার ও সমাজকে নিয়ে ভাবাই রাজনীতি। সার্বিকভাবে কোনো সমাজে মানুষের সার্বিক অগ্রগতির প্রচেষ্টাই হচ্ছে সেই সমাজের রাজনীতির মোদ্দা কথা। তবে উন্নতি ও অগ্রগতি সবসময়ই আপেক্ষিক। এসব স্থান, কাল ও পাত্রের আলোকে বিবেচিত হয়। এর যেমন বস্তুগত দিক রয়েছে একই সঙ্গে রয়েছে নৈতিক প্রেক্ষাপট যেটা আচার-আচরণের সঙ্গে যুক্ত। অনেক সময় কোনো সমাজের বেশিরভাগ মানুষের আচার-ব্যবহার সেই সমাজের মধ্যকার বৈষম্য সৃষ্টির জন্য দায়ী। সমাজের কেউ কেউ মনে করেন সামাজিক ব্যবহারবিধির ভিত্তি হওয়া উচিত ইতিমধ্যে স্বীকৃত কোনো মোরাল কোড এবং অবশ্যই এর ভিন্ন কিছু নয়। যদিও বস্তুগত সংস্কৃতি ও ব্যবহারবিধি দুটিই পরিবর্তনশীল এবং একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ও একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের প্রভাবে বিশেষ করে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা ব্যবহারবিধি পরিবর্তিত হয়ে থাকে। তবে নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি। কারণ এই সমাজে কোনো একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ছাড়া টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। যদিও হয় তা অনুগ্রহ নির্ভর এবং তাতে সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোতে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। যেমন আমাদের সমাজের বেশিরভাগ নারী সারা দিন গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এর কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন না থাকার কারণে তাদের অবস্থান ক্ষমতা কাঠামোর নিম্ন স্তরে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এটাও কি রাজনীতির অংশ? কেন না? অর্থনৈতিক কাঠামো যদি রাজনীতির অংশ হয় তাহলে এর সম্পর্ক নির্ভর ক্ষমতাকাঠামোর সবকিছু রাজনীতিরই অংশ।
রাজনীতিকে আমরা যেভাবেই দেখি না কেন, এতে একটি বৃহত্তর ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষমতা সম্পর্কযুক্ত থাকে আর এর সহজাত জটিলতার কারণেই সহজে একে ব্যাখ্যা করা কঠিন। রাজনীতির মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতির একটি সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে এই ক্ষমতা সম্পর্কগুলোর মধ্যে ভারসাম্যমূলক পরিবর্তন এবং সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকল্প সমাধান। রক্ষণশীল রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমান বা সাবেকি ধারণার চাষবাস এবং সেটাকে ক্রমাগত শুদ্ধতার মাপকাঠিতে দেখা, আপাতদৃষ্টিতে যার কোনো চূড়ান্ত পরিসীমা নেই। বিপরীতে, প্রগতিশীল রাজনীতির মূল বিষয় হচ্ছে নতুন চর্চা ও ব্যবস্থাকে আহ্বান করা, যার সবকিছু নিজস্ব হওয়ার ব্যবস্থা নেই, তবে নিজস্ব ভাবধারার আলোকে উদ্বুদ্ধ হওয়ার সুযোগ আছে।
আজকের দিনে আমরা অনেকেই সাধারণ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিস্পৃহতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকি। প্রচলিত অভিযোগ যে, এখন আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক এবং এখানে সমাজ নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই। তাই সামাজিক সমস্যা সমাধানে সামষ্টিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আজকের দুনিয়ার সামাজিক সমস্যা সমাধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেন্দ্রিক এবং অনেকটাই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। বেশিরভাগ মানুষই যেহেতু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত তাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিমধ্যে তাদের অংশগ্রহণ যে আছে তা বলাই বাহুল্য; তা হোক প্রান্তে বা কেন্দ্রে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতার প্রান্তে যারা আছে তাদের আমরা সত্যিকার অর্থে কেন্দ্রে আনতে চাই কি না?
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাজনীতি প্রথাগত কেতাবি রাজনীতি থেকে যে ভিন্ন তা সহজেই অনুমেয়। এখানে রাজনীতির একটি বড় ইস্যু হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা ও পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখানো। তবে এই সময়ের রাজনীতির বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে প্রচলিত ক্ষমতা সম্পর্কে পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হওয়া। অন্যকথায় সমান্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, ক্ষমতার চর্চা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ বা সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি নিশ্চিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। আর এই ধরনের সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মাঝে মাঝে বা একটি নির্দিষ্ট বিরতিতে পাত্র-পাত্রীর পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন হয় না, সেখানে কাঠামোগত অগ্রগতির লক্ষ্য অর্জন একটি দুরূহ বিষয়।
আর রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি এখানেই যেন থমকে গেছে। সাধারণ মানুষ এখান থেকে নতুন কিছু পাচ্ছে না, যেমন পাচ্ছে না বিকল্প উন্নয়ন মডেলের প্রস্তাবনা যা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম। অন্যথায় সাধারণ জনগণ কেন ব্যবস্থা ঠিক রেখে শুধু পাত্র-পাত্রী পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে যদি না এতে তাদের ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এক্ষেত্রে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনে প্রতিশ্রুতির কোনো বিকল্প নেই এবং এ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি উদ্যোগই প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থার পরিবেশ তৈরি ও চর্চা ছাড়া শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ কামনা নিছক আবদারের পর্যায়ে পড়ে। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত আচরণবিধি ও প্রথাগত নৈতিকতার দোহাই দিয়ে জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা থাকছে সেক্ষেত্রে মানুষকে সাময়িক উদ্বুদ্ধ করতে পারলেও সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত স্বার্থের বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ জনগণ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে পারে না। প্রচলিত রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টই তাদের এই প্রক্রিয়া থেকে বের করে দেয়।
এই অবস্থায় সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে এবং তাদের মাধ্যমে ক্ষমতাকেন্দ্রিক চর্চার পরিবর্তন করতে চাইলে তাদের বঞ্চনাগুলোকে রাজনীতির সামনে নিয়ে আসতে হবে এবং পাশাপাশি রাজনীতিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে উদ্ধার করাটাও আবশ্যক। বর্তমান এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এবং জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে কি এরকম কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে যেখানে জনগণ কাঠামোগত পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে পারে? সত্যিকার অর্থে তারা কি এমন কোনো কর্মসূচি জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছে যে কর্মসূচি ক্ষমতাবান ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ব্যবধান বা পার্থক্য কমিয়ে আনতে চায়, ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো বিকেন্দ্রীকরণ করতে চায়? বা প্রকৃতপক্ষেই সমস্যার সমাধান করতে চায়? তারা কি জাতিকে এমন একটি সমাজ কাঠামোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে যা বিভেদ ও বিদ্বেষকে দূরে ঠেলে দিয়ে সমতা ও সাম্যের বার্তা সামনে নিয়ে আসছে?
প্রথাগত রাজনীতিতে শুধু পক্ষ বা বিপক্ষ সমর্থন করা আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা। কারণ শুধু এই পক্ষ-বিপক্ষ চর্চার মাধ্যমে নতুন পথের সন্ধান তো পাওয়া যায়ই না, বরঞ্চ সজ্ঞানে একই ভুল বারবার করা। ভুল জেনেও পুরনো পথকে সমর্থন করতে বাধ্য হওয়া। এ যেন একই চক্রে বারবার ঘুরপাক খাওয়া, যে চক্রের প্রান্তে সাধারণ জনগণ আর কেন্দ্রে ঘুরেফিরে প্রায় সেই তথাকথিত একই শক্তি। তাই সাধারণভাবে রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণের নিস্পৃহতার দায় সাধারণের নয়, বরঞ্চ এখানো যারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন তাদেরই। জনগণকে তারা কতটুকু আস্থায় নিয়ে আসতে পারছেন সেটাই মুখ্য। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না প্রগতিশীলতা ও পরিবর্তনকামিতা ছাড়া যে রাজনীতি সেটা সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। এই পরিবর্তন শুধু পাত্র-পাত্রীর পরিবর্তন না এই পরিবর্তন হচ্ছে ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোর পরিবর্তন যা সবসময় গণমানুষের পক্ষে ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com