ঋণের সুদহার কম থাকা ও করোনাপরবর্তীকালে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি বাড়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমায় ব্যবসার খরচও বেড়েছে। এর প্রভাবে শিল্প খাতের ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ সময় ঋণ আদায় বেড়েছে ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। এর ফলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শিল্প খাত। তাই বিভিন্ন সেক্টরের মতো শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য ভালো হাওয়াতে আদায়ও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে বিতরণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ দশমিক ২৪ শতাংশ। জুন শেষে এ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৪ কোটি ২ লাখ টাকা।
এদিকে শিল্পঋণ বিতরণের পাশাপাশি আদায়ের হারেও উন্নতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ আদায় হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে ছিল ৮২ হাজার ৬৩৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতে ঋণ আদায় বেড়েছে ১৮ হাজার ৪৯০ কোটি ৯২ লাখ টাকা বা ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর তিন মাসের ব্যবধানে আদায় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বিতরণ করা শিল্পঋণের মধ্যে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এই অঙ্ক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৭ হাজার ৫৬০ কোটি ২৫ লাখ টাকা বা ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বকেয়া ছিল ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণের অঙ্ক ৯৫ হাজার ৯৪৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশই খেলাপি। ২০২১ সালের একই সময়ে শিল্পঋণে খেলাপি ছিল ৮৪ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ বিতরণ ২৫ দশমিক ১৩ শতাংশ বা ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা বেড়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে ছিল ১৪ হাজার ৮৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণের অঙ্ক যথাক্রমে ১৯ দশমিক ১, ৯ দশমিক ৯১ ও ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মূলধনি ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ছিল ৯১ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৭০৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বড় ও ক্ষুদ্র শিল্পে চলতি মূলধনি ঋণ বিতরণের অঙ্ক বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ২৬ দশমিক ২৫ ও ২২ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও মাঝারি শিল্পে ঋণ উল্টো কমেছে। এ সময়ে মাঝারি শিল্পে ঋণ ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকার শিল্পঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র শিল্পে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ২৮ ও ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মাঝারি শিল্পে ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কমেছে।
এ বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, ঋণ বাড়লে দেশের প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। জনগণের আয়ের উৎস সৃষ্টি হয়। তবে ঋণ কতটা আদায় হচ্ছে, সেটাই প্রধান বিষয়। ঋণ আদায় না হলে এ খাতের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত কয়েক যুগ ধরে এ খাতে যাচাইবাছাই ছাড়া অনেক ঋণ দেওয়া হয়েছে। যা এখনো আদায় সম্ভব হয়নি। এর ফলে এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই যাচাইবাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ খাতে ঋণ বিতরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মত এই জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের।