তিন মাসের কিস্তির অর্ধেক দিলেই খেলাপিমুক্ত

করোনা মহামারীর পর আবারও ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যবসায়ীদের চাওয়া অনুযায়ী ঋণের কিস্তি পরিশোধে আবারও বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে আর্থিক খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর) ঋণের কিস্তির অর্ধেক টাকা (৫০ শতাংশ) ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করলেই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে দেওয়া এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঋণখেলাপি থেকে মুক্তির জন্য এমন সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঋণ পরিশোধের মেয়াদকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানান ব্যবসায়ীরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট ডলার সংকটে ব্যবসায়ীরা নিজেদের অসুবিধার কথা জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ঋণ পরিশোধসহ নানা সুবিধার দাবি জানান। ব্যবসায়ীদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে চলতি অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের বকেয়া কিস্তির অর্ধেক পরিশোধ করলেই খেলাপি থেকে মুক্ত থাকার সুবিধা দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অশ্রেণিকৃত মেয়াদি ঋণের বিপরীতে ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রদেয় কিস্তির ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ ত্রৈমাসিকের শেষ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা হলে ওই ঋণ বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না। বহির্বিশ্বে যুদ্ধাবস্থা প্রলম্বিত হওয়ায় এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবে শিল্পের উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতাদের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- গতিশীল রাখা এবং ঋণগ্রহীতাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ সহজ করতে মেয়াদি ঋণের বিপরীতে ২০২২ সালের অক্টোবর হতে ডিসেম্বর সময়কাল পর্যন্ত প্রদেয় কিস্তিসমূহের ন্যূনতম ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ চলতি ডিসেম্বরের শেষ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা হলে ওই ঋণগুলো বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না।

এর মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত মেয়াদি ঋণসমূহের ২০২২ সালের এপ্রিল হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রদেয় কিস্তি বা কিস্তিগুলোর অপরিশোধিত অংশ বিদ্যমান ঋণের পূর্বনির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী এক বছরের মধ্যে সমকিস্তিতে (মাসিক ও ত্রৈমাসিক) প্রদেয় হবে। তবে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে অবশিষ্ট মেয়াদকালের সঙ্গে বর্ধিত এক বছর সময়কে বিবেচনায় নিয়ে কিস্তি পুনর্নির্ধারণপূর্বক নতুন সূচি অনুযায়ী আদায় করা যাবে। এর বাইরে আগের সার্কুলারের অন্যান্য নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে ব্যাংক খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ যাবৎকালে এটিই সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের অঙ্ক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। 

দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা।