ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত ফারদিন মাদক নেননি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশের (২৩) ময়নাতদন্তের ভিসেরা প্রতিবেদনে মাদক সেবনের অস্তিত্ব মেলেনি। একই সঙ্গে বিষপান বা অন্য কোনো ধরনের কেমিক্যালের উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর আগে হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন এমন তথ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে ফারদিনের শরীরের আঘাতের চিহ্নের বিষয়টিও শনাক্ত হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। দুই-এক দিনের মধ্যেই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মুশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা বলছেন, ভিসেরা প্রতিবেদন ময়নাতদন্তে চিকিৎসকের পার্টের একটি অংশ। নিহতের লিভারে যদি কোনো ধরনের কেমিক্যালের উপস্থিতি থেকে থাকে সেটি ভিসেরা রিপোর্টে পাওয়া যায়। তবে ফারদিন পানিতে ডুবে মারা গেছেন কিনা এ বিষয়টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আসার সুযোগ নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী ফারদিন পানিতে ডুবে মারা গেছেন, এ বিষয়টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসবে কিনা জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মুশিউর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়টি আনুষঙ্গিক প্রমাণাদি বলবে। তার গায়ে যে আঘাতের চিহ্নগুলো ছিল সেগুলো হয়তো অনেক ওপর থেকে লাফ দেওয়ার কারণে। কোনো শক্ত পদার্থের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারেন তিনি। সুলতানা কামাল ব্রিজটাই যদি আমরা কল্পনা করি পানি থেকে সেটির উচ্চতা অনেক বেশি। যেহেতু তিনি (ফারদিন) সাঁতার জানেন না সেহেতু অনেক ওপর থেকে লাফ দেওয়ার কারণে ওই সময়ই হয়তো তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।’

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেছিলেন, ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে, তার মাথায় ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আনুষঙ্গিক লক্ষণই প্রমাণ করবে আঘাতের ধরন। আঘাত বিভিন্ন কারণে পেতে পারে। যেমন দুর্ঘটনা হতে পারে, মানুষের দ্বারা হতে পারে, আত্মহত্যা হতে পারে। অনেক ধরনের হতে পারে। এখন আনুষঙ্গিক প্রমাণাদি বলবে কীভাবে আঘাত পেয়েছে। প্রাথমিক ভাবে আমরা যে আঘাতগুলো পেয়েছি সেগুলো লাফ দেওয়ার কারণে হয়তো পেয়েছে। এ ধরনের চিন্তা করা ছাড়া আর বিকল্প তো নেই।’ 

ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পায় ফারদিন মাদক সেবন করতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ চনপাড়া বস্তিতে যান। সেখানে মাদক সেবনের পর দাম দেওয়া নিয়ে মাদক কারবারিদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে খুন হন। এমন সংবাদ প্রকাশের পর ফারদিনের পরিবার ও সহপাঠীরা তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাদের দাবি, ফারদিন মাদক সেবন করে না। তারা এই ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্যই অপেক্ষায় আছেন। অবশেষে সেই দাবিই সত্য হলো ভিসেরা প্রতিবেদনে। 

এ বিষয়ে ফারদিনের বাবা কাজী নূরউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদক সেবনের মিথ্যা তথ্য সামনে এনে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করা হয়েছে। ফারদিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এখন আত্মহত্যা বলছে তদন্তকারীরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কখনই অন্তর্মুখী ছিল না। একজন বিতার্কিক, কোচিংয়ের শিক্ষক কখনো অন্তর্মুখী হতে পারে না। আমি আদালতে ন্যায়বিচার চাইব। তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে নারাজি দেব।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ‘ময়নাতদন্ত করার পর চিকিৎসকরা তখনই একটি মতামত দিয়েছেন। সেখানে লিখেছেন মৃত্যুর কারণ শনাক্ত হয়নি। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক হত্যাকা- বলার কারণ জানতে চাইলে তদন্তকারী এক কর্মকর্তা বলেন, ওই চিকিৎসক দক্ষ ছিলেন না। তিনি বেশ কিছু জিনিস এড়িয়ে গেছেন যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে একটি ছিল ফারদিনের মাথায় রক্ত জমা। এক্ষেত্রে মাথার চামড়া খুলতে হয়, সেখানে পানি দিয়ে দেখতে হয়। গলা ও ঘাড়ে চাপ দিতে হয়। তাহলে প্রকৃত কারণ প্রতিবেদনে উঠে আসে। কিন্তু চিকিৎসকরা কিছুই করেননি। বিষক্রিয়া ও মাদকের অস্তিত্বের বিষয়টি ভিসেরা প্রতিবেদনে আসবে, অন্য কিছু আসবে না। পানিতে ডুবে মৃত্যু হলে সে বিষয়টি ভিসেরা প্রতিবেদনে আসবে না।

গত ৪ নভেম্বর বিকেলে রাজধানী ডেমরার কোনাপাড়া নিজ বাসা থেকে পরীক্ষার কথা বলে বুয়েটের হলের উদ্দেশে বের হন ফারদিন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এরপর ৯ নভেম্বর রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করেন ফারদিনের বাবা। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিএমপির ডিবি মতিঝিল বিভাগ। গত ১৪ ডিসেম্বর ডিবিপ্রধান ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমে জানান, ফারদিন আত্মহত্যা করেছেন।

ফারদিনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাজীব আল মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের তদন্ত শেষ হয়েছে। ফারদিন আত্মহত্যা করেছেন। এখন ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আমাদের হাতে এলেই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেব।’