স্বাধীনতা সবার জন্যই কাক্সিক্ষত, বিশেষ করে যাদের স্বাধীনতা সীমিত এবং যাদের স্বাধীনতা বিভিন্ন উপায়ে খ-িত তাদের ক্ষেত্রে তা যেন বিশেষভাবে প্রযোজ্য। অন্যদিকে যারা কোনো না কোনোভাবে সুবিধাভোগী, ক্ষমতার পিরামিডের চূড়ায় আছেন তারা স্বাধীনতাহীনতার ভুক্তভোগী না। পরাধীনতা, বর্ণভেদ ও শ্রেণিভেদ প্রথা সমাজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রদ হলেও আদতে তা সমাজের পরতে পরতে রয়ে গেছে যা শ্রেণি ও গোষ্ঠীবিশেষের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণের জন্য দায়ী। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এই মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই ভূখন্ড ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বিজয় আমাদের অর্জিত হয়েছে। কিন্তু অর্ধশতাব্দীর এই পরিক্রমায় আমরা কতটুকু স্বাধীন হয়ে উঠতে পেরেছি তা বিশেষ প্রশ্নের দাবি রাখে।
আজকের যে বাংলাদেশকে আমরা দেখছি, এই ভূখ-ের স্বাধীন হয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। বলা বাহুল্য এজন্য এই দেশের সাধারণ জনগণকে শত সহস্র ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এর বিপরীতে বিদেশি শাসক গোষ্ঠী আমাদের অধীনস্ত করার জন্য যুগে যুগে বারেবারে হানা দিয়েছে, ধ্বংস করেছে জনপদের পর জনপদ। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর এই ভূখ-কে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক সংকট, বিরুদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। এতসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ক্ষমতা দখল ও পাল্টাদখল, রাজনৈতিক অনৈক্য, গোষ্ঠীবিশেষের অনৈতিক ক্ষমতার চর্চা ও অন্যের অধিকার হরণ ছিল অগ্রগণ্য।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে এদেশে যে উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তি রচিত হয়েছিল তা বেশিদিন ধরে রাখা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বিভিন্ন ধরনের ভঙ্গুরতাকে যেমন রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়েছে এবং একইসঙ্গে উদার, গণতান্ত্রিক আদর্শিক ধারাকে সমাজ থেকে ক্রমে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে মুক্তিসংগ্রামের আদর্শকে বিচ্যুত করা হয়েছে খুব সুচারুভাবে। এটা এমনভাবে হয়েছে যে, এখনো মুক্তিসংগ্রামের পুরনো সেই ভিত্তিভূমিতে ফিরে যেতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে এবং এ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত আছে।
জিইয়ে রাখা এই বিতর্কগুলোর অনেকগুলোই ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত। স্বাধীনতা শব্দটি বহুমাত্রিক, এতে যুক্ত অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের মতো অতিসাম্প্রতিক বিষয়সমূহও। অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় অগ্রগতি আছে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য ক্ষেত্রসমূহের গণ্ডি বাড়িয়েছে সত্যি কিন্তু প্রশ্নের উদ্রেক করেছে আরও বেশি। অধিকন্তু সমাজে অর্থনৈতিক বিভাজন যে কতটা প্রকট তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্বাধীনতা মানে নিজের অধিকারের চর্চা করা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করা। আমাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে যতটুকু স্বাধীনতা নিজেরা চর্চা করি অন্যের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য মনে করি না। অধিকন্তু যা আছে তা হচ্ছে অন্যের অধিকারে অনাহূত প্রবেশ বা নিদেনপক্ষে অবহেলা। অন্যের স্বাধীনতা ও অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে না পারা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের আদর্শের চেতনাবিরোধী। বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের প্রেক্ষাপট হচ্ছে অন্যের ওপর অন্যায় বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে বঞ্চনা থেকে রক্ষা পাওয়ার আকাক্সক্ষা। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় তখনই অর্থবহ হবে যখন সব ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অর্জিত হবে যদিও তা মোটেই সহজ বিষয় নয় বরঞ্চ অনেক অনেক প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ।
আমাদের স্বাধীনতার সুফল আদায়ে যতটুকু অপূর্ণতা তার একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে এই ঘাটতি থেকে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বৈ সংকুচিত হয়নি। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হচ্ছে মুক্তির সনদ। শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির সনদ। এই মুক্তি শুধুমাত্র ভূখ- অর্জন নয়, এটি কর্র্তৃত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী থেকে মানুষের মুক্তি।
অনেক সময় বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব সমস্যাকে শুধুমাত্র শাসনব্যবস্থা সম্পর্কিত অব্যস্থাপনার সঙ্গে দায়ী করা হয় এবং এর যথেষ্ট সারবত্তাও আছে। মানুষের নানা ধরনের অধিকারহীনতা ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের পেছনে অন্যতম কারণ দীর্ঘসময় ধরে শাসনব্যবস্থার অকার্যকারিতা। আর এর সুযোগ নিয়েই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো মুক্তিসংগ্রামের মূল আদর্শ থেকে জাতিকে বিচ্যুত করতে পেরেছে ও এখনো পারছে। অন্যদিকে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ থেকে হলেও তা শুধু বাঙালিদেরই ঐক্যবদ্ধই করেনি এমনকি ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জাতি-গোষ্ঠী ও তাদের সংস্কৃতিকেও ধারণ করতে পেরেছিল। ফলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও বিক্রমে পাকিস্তানি বাহিনীকে মাত্র ৯ মাসের মাথায় পরাজিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু সেই বিজয়টাই যেন ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে গেল। যে বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরা একটা দেশ পেলাম সেই দেশটাই সত্যিকার অর্থে মানুষের প্রত্যাশিত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারছে না। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতাকে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহার করেছে। জাতিকে দিকভ্রান্ত করেছে, জাতির সামনে বৈষম্যমূলক ও গোষ্ঠীগত আদর্শকে এই দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।
বিভক্তি কোনো সমাজের জন্য মঙ্গল নিয়ে আসে না, রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠাই আমাদের অগ্রগতির মূলমন্ত্র। কিন্তু ঐকমত্য অর্জনের আদর্শিক ভিত্তি কী? সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আর এখানেই আমাদের মুক্তিসংগ্রামের আদর্শিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিভূমি খুব বেশি প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে একটি শাসকশ্রেণি যেমন গড়ে উঠেছে, একই সঙ্গে গড়ে উঠেছে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বা এদের অংশীদার। সাধারণভাবে এদের চিহ্নিত করা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। বাংলাদেশে যখনই কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি সামনে উঠে আসে এবং জাতীয় ইস্যু হিসেবে একধরনের ঐকমত্য তৈরি হয় তখনই সেই গোষ্ঠী সংস্কার প্রক্রিয়াকে বেহাত করার জন্য যারপরনাই ব্যাকুল থাকে যার দৃষ্টান্ত আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসেরও বাঁকে বাঁকে। এই পরিস্থিতিতে এদের মোকাবিলা করতে পারাটাই যেন স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে একধাপ অগ্রগতি এবং এটাই সময়ের দাবি।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com