দিন শেষে স্বস্তিটা এই ৬ ওভারে কোনো উইকেট পড়েনি। এমন গোধূলি মুহূর্তে কতবারই তো পথ হারিয়েছে বাংলাদেশ। যত কম ওভারই হোক না কেন দুই-তিন উইকেট হারিয়ে টেস্ট হারের এপিটাফ লিখে ফেলতে হতো। তবে কাল নাজমুল হোসেন শান্ত ও জাকির হাসান ৭ রানে অবিচ্ছিন্ন থেকে বাংলাদেশকে ম্যাচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে গেলেন। কোনো উইকেট না হারানোর স্বস্তির সঙ্গে ভারতের ইনিংস কম রানে গুটিয়ে দেওয়ার আনন্দও আছে। ঋষভ পান্ত ও শ্রেয়ার আইয়ারের ব্যাটে ভারতের রান মনে ভয় ধরাচ্ছিল বড় স্কোরের। দুজনে মিলে মোট তিনবার জীবন পেয়ে এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। শেষে দুজনকেই হতাশ করে বাংলাদেশ বোলাররা ভারতকে ৩১৪ রানে অলআউট করেন। লিড দাঁড়ায় ৮৭ রানের। শেষ সেশনে ভারতকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। এই অবস্থান থেকে ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখাটা দুঃসাহস নয়। এর জন্য গতকাল দিন শেষের ভালোটা আজ ধরে রাখতে হবে।
তবে দ্বিতীয় দিন শেষে ভারতের ওপর চেপে বসার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। ৮৭ রানের লিডও হয়ত পেত না ভারত। যদি নুরুল হাসান সোহান, মেহেদী হাসান মিরাজ বা লিটন দাস পান্ত-আইয়ারকে সুযোগ না দিতেন। এ দুই ব্যাটার মিলে ইনিংসের শুরুতেই তিনবার জীবন পেয়েছেন। সিøপে মিরাজের বলে ১১ রানে থাকা পান্তর ক্যাচ মিস করেন লিটন। জীবন পেয়ে এই বাঁহাতি ৯৩ রানে থামেন। আর আইয়ার ১৯ ও ২১ রানে দুবার জীবন পান। প্রথমে গালিতে মিরাজের হাতে বল জমেনি তাসকিনের বলে। সুযোগটি কঠিন ছিল। তবে পরেরবার এত সহজ সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি সোহান। ২১ রানে থাকা আইয়ার সাকিবের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্রিজের বাইরে থাকলেও বল ধরতে ব্যর্থ হন সোহান। তাই স্টাম্পিংয়ের সুযোগ মিস করেন। পরে আইয়ার থামেন ৮৭ রানে। চট্টগ্রাম টেস্টে পূজারার ক্যাচ ফেলেছিলেন সোহান। দুই ব্যাটারকে দ্রুত ফেরানো গেলে দিন শেষে উল্টো লিড নিতে পারত বাংলাদেশ।
সংবাদ সম্মেলনে এসে তাইজুল ইসলামও পান্ত-আইয়ারকে ঠিক সময়ে আউট না করার আক্ষেপ করলেন, ‘সত্যি কথা বলতে আমাদের এখানে (ব্যাটারকে প্রথম সুযোগে আউট করার ক্ষেত্রে) একটু কমতি আছে। কমতিটা এ রকম যে বড় বড় দলের সঙ্গে খেলতে গেলে হয়তোবা এ সুযোগগুলো (একাধিকবার) পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের সঙ্গে হয়তো বিপক্ষ দলগুলো দুই-একটা সুযোগ বেশি পেয়ে থাকে। সেই সময় দুই-তিনটা সুযোগ আসছিল। আমরা যদি ওই দুই-তিনটা সুযোগ নিতে পারতাম তাহলে কিন্তু আমাদের রানের আগে, তাদের অলআউট করা সম্ভব ছিল। তো সুযোগ নেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইনশাল্লাহ এই ব্যাকফুটে চলে যাওয়া আমরা দ্রুতই কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করব।’ জীবন পেয়ে দুই ব্যাটার উইকেটে সেট হয়ে যান। জুটি দাঁড়িয়ে গেলে বাংলাদেশ বোলারদের ওপর দাপট দেখিয়ে খেলেন দুজনে। ওই সময় একটু বেশি রান দিয়ে দেন তাইজুলরা। সংবাদ সম্মেলনে এই আক্ষেপও করলেন তাইজুল। তবুও ৮৭ রানের লিড বাংলাদেশকে খুব বেশি পিছিয়ে দিচ্ছে না বলে জানালেন তাইজুল, ‘সব মিলিয়ে বলতে গেলে লাঞ্চের পরের সেশনটা আসলে আমাদের একটু ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। আমরা যদি ওই সময়টা আরও একটু কম রান দিয়ে রাখতে পারতাম, উইকেট যদি নাও আসত, একটু কম রান দিলে আরও ভালো অবস্থায় থাকতে পারতাম। তারপরও আমি বলব যে আমরা খুব যে খারাপ জায়গায় আছি তা না।’
পুরো দিনে ভারতের ইনিংসকে দুই ভাগে রাখা যায়। ঋষভ পান্তর ক্রিজে আসার আগে ও পরে। পান্ত ব্যাটিংয়ে নামার আগ পর্যন্ত যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও দাপট নিয়েই বল করছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এই বাঁহাতি ক্রিজে আসার পর শুরু হয় ছন্দপতন। দিনের শুরুটা হয় তাইজুলে। গত টেস্টে বাংলাদেশের সেরা বোলার দ্রুতই অপরাজিত দ্ইু ওপেনার লোকেশ রাহুল (১০) ও শুভমান গিলকে (২০) এলবিডব্লিউ করে ফেরান। লাঞ্চের পর বিরাট কোহলির উইকেট বাংলাদেশের জন্য দিনের অন্যতম সাফল্য। ৫৫ বলে ২৪-এ পৌঁছে যাওয়া কোহলিকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল। কিন্তু কোহলিকে ২৪ রানেই থামান তাসকিন। সেরা ব্যাটারকে আউট করতে টেস্টের সেরা বলটাই করেছিলেন এ পেসার। গুডলেন্থ থেকে এক্সট্রা বাউন্স হয়ে বলটি কোহলির ব্যাটের বাইরের কানা ছুঁয়ে যায় সোহানের গ্লাভসে। এমন অসম্ভব ডেলিভারিতে পরাস্ত হতে হয় বিশ্বের সেরা ব্যাটারকেও। ৯৪ রানের মধ্যে কোহলিসহ ভারতের চার উইকেট তুলে নেওয়া দারুণ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পান্ত আসতেই থমে যায় সব। আঁটসাঁট বোলিং ভুলে যাওয়ার সঙ্গে ফিল্ডিংয়েও করুণ দশা শুরু।
এক পান্তকে নিয়েই সব দুশ্চিন্তা ছিল। টেস্ট খেলতে নেমেও ক্যারিয়ারে কতবার টি-টোয়েন্টি স্টাইলের ব্যাটে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। কব্জির মোচড়ে কীভাবে যেন একের পর এক অবিশ্বাস্য শট নিয়ে ফেলেন। সে সবে বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারি হয় অনায়াসে। তার ব্যাটেই বাংলাদেশ পথহারা হয়। ১০৪ বলে ৫ ছক্কা ও ৭ চারে ৯৩ রান করেন পান্ত। ক্যারিয়ারে এ নিয়ে ষষ্ঠবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হন। সঙ্গে আইয়ারের ১০৫ বলে ২ ছক্কা ও ১০ চারে ৮৭ রান ভারতকে দ্রুত আউট হওয়ার বিপদ থেকে টেনে তোলে। দুজনের ব্যাটে ১৮২ বলে ১৫৯ রান আসে ভারতের। কাল দিনের দ্বিতীয় সেশনে এই জুটিই ভারতকে এগিয়ে দেয় রানের দিক থেকে। দলীয় ২৫৩ রানে পান্তর বিদায়ের পর ভারতকে খুব বেশি এগোতে দেননি সাকিব। আইয়ার, অক্ষর প্যাটেল (৪), রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে (১২) দ্রুত তুলে নেন। ভারতের শেষ ৫ উইকেটের চারটিই নেন সাকিব। তাই মাত্র ২৫৩ রানের পর মাত্র ৬১ রানে গুটিয়ে যায় ভারত। এতে বিশ্বের ২০তম ক্রিকেটার হিসেবে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৬৫০’র বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়লেন সাকিব। ওদিকে তাইজুল ৭৪ রানে ৪ উইকেট নেন।
কাল শেষ সেশনে দারুণ বোলিংয়ে ফিল্ডারদের ভুল আড়াল করে দিয়েছেন বোলারা। এবার দলকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটা ব্যাটারদের। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসের মতো একটা দৃঢ় দলীয় ইনিংস বাংলাদেশকে দারুণ অর্জনের দিকে নিতে পারে।