রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে টিকিট কালোবাজারি চক্রের অন্যতম হোতা আব্দুল হাকিমসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র্যাব বলেছে, চক্রটি অন্য লোক লাইনে দাঁড় করিয়ে কাউন্টার থেকে এবং অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করত।
গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পৃথক অভিযানে রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩। তাদের কাছ থেকে ট্রেনের ২১টি টিকিট, ৫টি মোবাইল ফোনসেট, ৩টি সিমকার্ড, ২টি মানিব্যাগ, একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ও টিকিট বিক্রির নগদ ৯ হাজার ৮১৮ টাকা উদ্ধার করা হয়।
চক্রের প্রধান ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেন, জয়নাল আবেদীন (৫৯), শামীম ওরফে সম্রাট (২৭), আব্দুল জলিল (১৯), খোকন মিয়া (৫৫) ও উজ্জল ভূঁইয়া (৩৩)।
র্যাব জানিয়েছে, রিকশাচালক, শ্রমিক ও দিনমজুরদের অল্প টাকার বিনিময়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে তাদের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করত চক্রটি। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির এনআইডি ব্যবহার করে অনলাইনেও টিকিট সংগ্রহ করত। এরপর ওইসব টিকিট সাধারণ যাত্রীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করত। বিশেষ করে যারা কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট না পেয়ে ফিরে যান তাদের কাছে বিক্রি করে এসব টিকিট। চক্রটি ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে ৫০০ টাকার টিকিট ২ হাজার টাকায়ও বিক্রি করেছে বলে জানায় র্যাব।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর টিকাটুলীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনসহ সারা দেশের ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছিল সংঘবদ্ধ একটি চক্র। কমলাপুর রেলস্টেশনে এই কালোবাজারি চক্রটির অন্যতম হোতা মো. আব্দুল হাকিম। তারা রেলস্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন এনআইডি ব্যবহার করে টিকিট সংগ্রহ করত। এ ছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন এনআইডি ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেও টিকিট সংগ্রহ করত চক্রের সদস্যরা। এভাবে টিকিট সংগ্রহের পর আব্দুল হাকিমের নেতৃত্বে ট্রেন ছাড়ার ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে তারা বেশি দামে টিকিট বিক্রির তৎপরতা শুরু করত। ট্রেন ছাড়ার সময় যত ঘনিয়ে আসে তাদের মজুদ করা কালোবাজারি টিকিটের দাম তত বাড়তে থাকে। তারা সাধারণত দ্বিগুণ দামে টিকিট বিক্রি করত। সুযোগ ও সময় বুঝে অনেক ক্ষেত্রে তারা টিকিটের দাম আরও বাড়িয়ে দিত।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আরও বলেন, চক্রটি মূলত তূর্ণা নিশীথা, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, তিস্তা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, চট্টলা এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস এবং পারাবত এক্সপ্রেসের টিকিট কালোবাজারি করত। চক্রের আলাদা আলাদা গ্রুপে ৫ থেকে ৭ জন করে সক্রিয় সদস্য রয়েছে, যারা টার্গেট করা ট্রেনগুলোর টিকিট কালোবাজারি করে।
র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার করা ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, চক্রের মূল হোতা হাকিম নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে ও রেলস্টেশনে কর্মরত অসাধু একটি চক্রের যোগসাজশে ২০১৮ সাল থেকে টিকিট কালোবাজারির শুরু করেন। তিনি মূলত নিজে টিকিট কাটার কাজ না করে চক্রের সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করে চড়া দামে বিক্রি করতেন। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালেও তিনি কখনো গ্রেপ্তার হননি। যে পরিমাণ টিকিট রেলস্টেশনে বিক্রির জন্য বরাদ্দ থাকে তার মধ্যে ৫০ শতাংশ বিক্রি হয় অনলাইনে। যার ফলে কাউন্টারে এসে অনেকে টিকিট না পেয়ে ফিরে যান। আর এই সুযোগটিই নেয় টিকিট কালোবাজারি চক্রের সদস্যরা।
আরিফ মহিউদ্দিন আরও বলেন, চক্রটির মূল হোতা হাকিম দেশজুড়ে টিকিট কালোবাজারির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন।
তিনি জানান, এ চক্রের সদস্য খোকন মিয়ার নামে টিকিট কালোবাজারির দায়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৫টি মামলা রয়েছে। গত ২০ অক্টোবর র্যাব-৩ এর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে ৩২ দিন জেল খেটে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। এরপর আবারও একই অপরাধে জড়িত হয়েছেন। আরেক সদস্য শামীমের বিরুদ্ধে মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ভোগ করেছেন।