ভোট চুরির দুরভিসন্ধি থাকলে আজিজ মার্কা ইসি করতাম

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশ এখন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে দেশকে উন্নত করতে, এগিয়ে নিয়ে যেতে। তারা দেশকে সেভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়োগ আইন সংসদে পাস করার প্রসঙ্গ টেনে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের যদি জনগণের ভোট চুরির দুরভিসন্ধি থাকত, তাহলে আমরা এটা কেন করব? খালেদা জিয়ার মতো ওই আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন আমরা করতাম। তা তো আমরা করি নাই। আমাদের জনগণের ওপর আস্থা আছে, বিশ্বাস আছে। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা চলি।’

এ সময় ইসি ও নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের নির্বাচন হয়েছিল। নিজের জীবদ্দশায় বাংলাদেশের স্বার্থ কখনো নষ্ট হতে দেব না। আমরা এটা দেখেছি, ভোট চুরি করে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না। খালেদা জিয়া ভোট চুরি করে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কারও ভোট চুরি করলে বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেয় না। এদেশের মানুষ মেনে নেয়নি। সেই সময় গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। খালেদা জিয়া ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল। আর ৩০ মার্চ পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। বাংলার জনগণ তাকে বাধ্য করেছিল।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগের অবদান তুলে ধরেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের এতটুকু স্বার্থ আমার জীবন থাকতে নষ্ট হবে নাআমার এই প্রতিজ্ঞাই ছিল। হয়তো সে কারণে আমরা আবার আসতে পারিনি। তাতে আমার কোনো আফসোস নেই।’ টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগের সম্মেলন শুরু হয়। শুরুতে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা। দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং জনগণের ওপর তাদের আস্থা আছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জানি ভোট নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। অনেকে বিষয়টাকে কন্ট্রোভার্সিয়াল করতে চান। আমরা নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন করে দিয়েছি। রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করছেন। সেখানে আওয়ামী লীগ কোনো হস্তক্ষেপ করে না। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দিয়েছি। বাজেট থেকে তাদের সরাসরি টাকা দেওয়া হয়। আমরা ভোটার আইডি কার্ড করে দিয়েছি। ইভিএম কিছু কিছু চালু হয়েছে। সেখানে কোনো কারচুপি করার সুযোগ আছে বলে আমরা জানি না।’

বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘অশুভ শক্তি যতই আমাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করুক, বাঙালি বাঙালি হিসেবেই এগিয়ে যাবে অগ্রযাত্রার পথে। আঘাত আসবে, ষড়যন্ত্র আসবে সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাবে, সেটাই আমরা চাই। বাংলাদেশ আর পিছিয়ে যাবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আমরা সেভাবেই দেশ পরিচালনা করব। জাতির পিতার স্বপ্ন আমরা পূরণ করব।’

দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, যার যেটুকু জমি আছে চাষ করেন। উৎপাদন করেন। আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। মাছ, মাংস, দুধ, ডিমের উৎপাদন বাড়াচ্ছি। উৎপাদন বাড়িয়ে আমাদেরটা আমরা খাব, কারও কাছে হাত পাতব না এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চলতে হবে। আমাদের সেটা পারতে হবে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে গঠনতন্ত্র মেনে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা ১০টি জেলা বাদে প্রতিটি জেলা ও অনেকগুলো উপজেলায় সম্মেলন করেছি। যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোর সম্মেলন আমরা করব।’

জাতির পিতাকে সপরিবার হত্যার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওই সময় বিদেশে থাকায় দুই বোন বেঁচে যাই। আমাদের রিফিউজি হিসেবে থাকতে হয়েছে। পঁচাত্তরের পর এ দেশের মানুষ শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়েছিল। এরপর এ রকম এক কাউন্সিলে আমাকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ছোট বোন রেহানার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দেশে আসতেই হবে। এমন দেশে আসি যেখানে খুনিদের বিচার হবে না বলে ইনডেমনিটি দিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা হয়েছিল। আমার থাকার জায়গা চিন্তা না করে চলে এসেছি। স্বাধীনতা যেন ব্যর্থ না হয়, স্বাধীনতার সুফল যেন ঘরে ঘরে পৌঁছে, সেটা নিশ্চিত করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য।’

টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে আমরা ক্ষমতায় আসি। আজ ২০২২। এতদিন টানা ক্ষমতায় আছি বলেই দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি। বাজেট ১০ গুণ বাড়িয়েছি। কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করেছি। প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে তুলতে পেরেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য কভিড-১৯ অতিমারী সেই প্রবৃদ্ধি কিছুটা হলেও ব্যাহত করে। এরপরও আমরা এটা ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। তবে এখন আবার এসেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং স্যাঙ্কশন। এই যুদ্ধের ফলে সারা বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত। তারা অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে। তারপরও আমরা অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে পেরেছি। কিন্তু এর আঘাতটা তো আমদের ওপর আসবে!’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা মাথাপিছু আয় ৫৩৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে উন্নীত করতে পেরেছি। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় আনতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘সরকার ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। প্রতিটি ঘরে আমরা বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। মূল্যস্ফীতি। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। আমাদেরও সেই ধাক্কায় পড়তে হলো। এ জন্য কিছুদিনের জন্য লোডশেডিং দিতে হয়েছিল। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছি। তবে আমার অনুরোধ থাকবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে মিতব্যয়ী হতে হবে। এতে আপনাদেরও বিল কমবে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘কভিড-১৯ মোকাবিলায় অনেক দেশ হিমশিম খেয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থেকেছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে মোকাবিলা করেছি। বিনামূল্যে টিকা দিয়েছি। টিকা কেনার জন্য আগাম অর্থ দিয়েছি। বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ দিয়েছি। হাসপাতালে বেড বাড়িয়েছি। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি। মানুষকে নগদ অর্থ দিয়েছি। কোনো শ্রেণি বাদ নেই, যাদের আমরা সহায়তা দেইনি।’

ডেটা সেন্টার, স্কুল ফর ফিউচার, ইনকিউবেটর, হাইটেক পার্ক, আইটি সেন্টার ইত্যাদি গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যে আওয়াজ আমরা শুনছি, তার উপযুক্ত নাগরিক যাতে গড়ে ওঠে, সেই পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমরা ২০৪১ সালে যে স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলছি, সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমরা আয়োজন করেছি। আমরা ভবিষ্যতে দেখতে চাই জনশক্তি স্মার্ট হবে। তারা সবকিছু অনলাইনে করতে পারবে। আমাদের ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি। ২০৪১ সালের মধ্যে এটা করতে সক্ষম হব।’