ছাত্রলীগের হামলা ও পুলিশের বাধার মধ্য দিয়ে গতকাল সারা দেশের জেলা ও মহানগরে গণমিছিল কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পঞ্চগড়ে যুবদল নেতা আব্দুর রশীদ আরেফিনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ বিভিন্ন জেলার গণমিছিল থেকে অন্তত ৬০ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে গতকাল শনিবার সারা দেশের (ঢাকা ও রংপুর ছাড়া) জেলা ও মহানগরে গণমিছিল কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
গতকাল সন্ধ্যায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স অভিযোগ করে বলেন, ‘পঞ্চগড়ে পুলিশের গুলিতে যুবদল নেতা আব্দুর রশীদ আরেফিন নিহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন জেলায় গণমিছিল থেকে অন্তত ৬০ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আব্দুর রশীদ আরেফিনের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদীঘি ইউনিয়নের পাথরাজে। তিনি ময়দানদীঘি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ওসির নির্দেশে পুলিশ বিএনপির মিছিলে গুলি করে হত্যা করে ও বেধড়ক লাঠিপেটা করে। পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান বাবুসহ আরও অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। পুলিশ এখনো নিহত আরেফিনের লাশ ঘিরে রাখে। পরিবার ও নেতাকর্মীদের কাছে লাশ হস্তান্তর করছে না।
আরেফিন নিহত হওয়ার ঘটনায় আজ সারা দেশে গায়েবানা জানাজা পড়বেন বিএনপির নেতারা। আর বাদ আছর নয়াপল্টনে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোনায়েম মুন্না, সাংগঠনিক সম্পাদক ইসাহাক সরকার, বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী প্রমুখ।
আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, দুপুরে গণমিছিলের প্রস্তুতি নেয় জেলা বিএনপি। বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। পরে গণমিছিল বের করলে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।
বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট হাবিব আল আমিন ফেরদৌস বলেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করেছে। পুলিশের রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জে আমাদের প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছে। অনেকেই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তৌফিক আহামেদ বলেন, আব্দুর রশীদ আরেফিন নামে এক ব্যক্তির মৃতদেহ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা যান। তবে কীভাবে বা কী কারণে তিনি মারা গেছেন, তা পোস্ট মর্টেম ছাড়া বলা যাবে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল ইসলাম জানান, পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলেও গুলি চালায়নি।
তবে পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল হুদা সন্ধ্যায় নিজ অফিসে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ঘটনাটা ঘটেছে সাড়ে ৩টায়। নিহত ব্যক্তি হার্টের রোগী। বেলা আড়াইটার দিকে কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে তিনি অসুস্থ বোধ করলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর পূর্বনির্ধারিত গণমিছিল কর্মসূচি ছিল। স্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কিন্তু তারা শান্তিপূর্ণ মিছিল না করে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। বাধ্য হয়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে পুলিশের ১০-১২ জন সদস্যসহ বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ঘটনায় কোনো গ্রেপ্তার নেই। সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর আক্রমণ, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে নরসিংদীর চিনিশপুরে জেলা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে কেন্দ্র ঘোষিত গণমিছিল করার কথা থাকলেও মোড়ে মোড়ে পুলিশি বাধার মুখে চিনিশপুরের ঈদগাহ মাঠে সমবেত হন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে সেখান থেকে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মনজুর এলাহীর নেতৃত্বে গণমিছিলটি বের হয়ে চিনিশপুর কালীমন্দির মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
অন্যদিকে গণমিছিলকে ঘিরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয় পুলিশ। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ১৭ জনকে আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে জানান সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কাশেম ভূঁইয়া।
বরিশাল নগরীর অশি^নী কুমার টাউন হল এলাকায় বিএনপির কার্যালয়ের সামনে গণমিছিল-পূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘দেশের মানুষ এই সরকারের পতন চায়। আর এই পতনের আন্দোলনে ইতিমধ্যেই অনেকে জীবন দিয়েছেন। তাদের সেই ত্যাগ বৃথা যেতে দেব না। জীবন দিয়ে হলেও এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা আমাদের রক্ষা করতে হবে। এই সরকারের পতন নিশ্চিত করতে হবে।’
চুয়াডাঙ্গায় গণমিছিলের প্রস্তুতিকালে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শরীফুজ্জামানসহ ৫ নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। আটক নেতারা হলেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শরীফুজ্জামান, সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক আবু, আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রোকন, আইলহাস বিএনপি নেতা আবু হানিফ ও জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব খান। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পালনের প্রস্তুতি চলছিল। ওই কর্মসূচি পন্ড করতে পুলিশ সদস্যরা দলের নেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। পরে তাদের জোরপূর্বক আটক করে নিয়ে যায়।
তবে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আনিসুজ্জামান জানান, বিএনপির মিছিল থেকে হামলা, ভাঙচুর ও ক্ষতির আশঙ্কার তথ্য ছিল। পরিস্থিতি অশান্ত করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে আটককৃতদের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নানের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, মহানগরীর রাজবাড়ী সড়কের জজ কোর্ট সংলগ্ন এলাকায় বিএনপির গণমিছিলে যোগ দিতে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শনিবার বিকেলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ ও কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বিএনপির ২০ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন সদর থানার ওসি জিয়াউল ইসলাম জানান, বিএনপির মিছিল থেকে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় পুলিশের নায়েক জহির ও কনস্টেবল মিন্টু মিয়া আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে।
আমাদের নোয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গণমিছিলটি জেলা জামে মসজিদের সামনে গেলে পুলিশি বাধার মুখে পন্ড হয়ে যায়। এরপর সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ করেন।
খুলনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পুলিশ খুলনায় নগরীর ডি কে ঘোষ রোড এলাকায় বিএনপির কার্যালয়ের প্রবেশপথগুলোতে ব্যারিকেড দেওয়ার কারণে গণমিছিল করতে পারেনি বিএনপি। তবে কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেছে তারা। সেখানে পুলিশ জলকামান, প্রিজন ভ্যান নিয়ে অবস্থান নেয়।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পুলিশের বাধায় গণমিছিল করতে পারেনি জেলার নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণমিছিল বের করে কয়েক কদম এগোনোর পর পুলিশ আর মিছিলটি এগোতে দেয়নি। পরে সেখান থেকে পুলিশ বিএনপির ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা নেতারা।
আমাদের পিরোজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বেলা ১১টার দিকে শহরের পোস্ট অফিস সড়কের পাশে বিএনপির কার্যালয়ে আসতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। এ সময় জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরে একটি মিছিল বের করেন। এরপর তারা ক্রিকেট ব্যাট, স্টাম্প ও লাঠি নিয়ে সোনালী ব্যাংকের সামনে অবস্থান নেয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা পুরনো জেলখানার সামনে জড়ো হয়েছেন এমন খবরে সেখানে ছাত্রলীগের সভাপতি অনিরুজ্জামান অনিক এবং সাধারণ সম্পাদক ইখতেখার মাহমুদ সজলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছুটে যায় এবং বিএনপি কার্যালয়ে হামলা চালায়। এতে বিএনপির কমপক্ষে ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আলমগীর হোসেন।
আমাদের বাগেরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়কের বাড়ি এবং শহরের সরুই এলাকার দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ টি এম আকরাম হোসেন স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেছেন, ‘সকাল ১০টার দিকে আমার চাচাতো ভাই আলী রেজা আহমেদের স্ত্রী মারা গেছেন। আমরা তার দাফন-কাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী মোটরসাইকেলে এসে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় মৃত্যুর খবর শুনে বাসার সামনে আসা স্বজন ও প্রতিবেশীদের ধাওয়া করে। তাদের বসার জন্য আনা চেয়ার ও বাড়ির ভেতর ঢুকে কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়।
চাঁদপুর : বিকেলে শহরের হাজী মহসিন রোডের সামনে থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশের পরে গণমিছিল বের করেন। মিছিল নিয়ে শহরের হাজী মহসিন রোড প্রদক্ষিণ করে হাসান আলী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে গিয়ে শেষ করেন। এর আগে শহরের চিত্রলেখা মোড়ের সমাবেশে বক্তব্য দেন বক্তারা।প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন পঞ্চগড়, নরসিংদী, বরিশাল, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর, নোয়াখালী, ফরিদপুর, পিরোজপুর, খুলনা ও বাগেরহাট, চাঁদপুর প্রতিনিধি।