স্যাম ব্যাংকম্যান ফ্রিড। অনলাইন গেমিংয়ের তরুণ উদ্যোক্তা। এফটিএক্স প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গড়ে তোলেন কিপ্টোকারেন্সির বিশাল সাম্রাজ্য। মাত্র পাঁচ বছরে আয় করেন ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে তরুণ বিলিয়নিয়ারের তালিকায় নাম লেখান এই মার্কিন বিনিয়োগকারী। কিন্তু সবাইকে অবাক করে এ বছরের নভেম্বরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেউলিয়া হন কিপ্টোকারেন্সির এই বিলিয়নিয়ার । লিখেছেন নাসরিন শওকত
মেধাবী স্যাম
স্যামুয়েল বেঞ্জামিন ব্যাংকম্যান ফ্রিড। অনলাইন গেমিংয়ের তরুণ মার্কিন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও সাবেক ধনকুবের। ডিজিটাল মুদ্রাবাজারে যিনি এসবিএফ নামেই বেশি পরিচিত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ এফটিএক্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আলেমেদা রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন।
১৯৯২ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক ইহুদি পরিবারে জন্ম স্যামের। বাবা জোসেফ ব্যাংকম্যান আর মা বারবারা ফ্রিড। তারা দুজনই স্ট্যানফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিষয়ের সাবেক অধ্যাপক। স্যামের বিরুদ্ধে ক্রিপ্টো জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার অনেক আগে, উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্তর্মুখী ও এক পড়ুয়া ছেলে ছিলেন তিনি। সিলিকনভ্যালির নামিদামি প্রি স্কুলে পড়া শুরু। ক্যালিফোর্নিয়ার হিলসবোরোর ক্রিস্টাল স্প্রিং আপল্যান্ড প্রি হাইস্কুলে ভর্তি হন। স্যাম ও তার ছোট ভাই গ্যাবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি সদস্যদের আদর-যত্নের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন। হাইস্কুলে গণিতের সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে সুখ্যাতি ছিল স্যামের। আবার সেখানের ‘পাজল হান্ট ক্লাবের’ নেতাও ছিলেন। স্যাম হাইস্কুলের স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। নিরামিষভোজী স্যাম রাতে ঘুমান মাত্র ৪ ঘণ্টা । ভিডিও গেম খেলা তার নেশা। লিগ অব লিজেন্ডস তার প্রিয় গেম। কেন তিনি এই গেম খেলেন তার কারণ ব্যাখ্যা করে এক বছর আগে একাধিক টুইটে স্যাম বলেছিলেন, দলীয় মজাদার এই লড়াইয়ের খেলা খেলতে খেলতেই তার মাথা থেকে দুটি কোম্পানির প্রতিদিনের কোটি কোটি ডলারের ব্যবসার দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। টুইটারে স্যামের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
ক্রিপ্টোকারেন্সির রাজা
রাতারাতি ধনী হওয়ার গল্প শোনা যায়। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিলিয়নিয়ার থেকে দেউলিয়া হয়েছেন, এমনটা বিরল। তবে স্যামের বেলায় ঘটেছে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। কিপ্টোকারেন্সির রাজা স্যামের পতন যতটা হতাশাজনক, উত্থান তার চেয়েও অনেক নাটকীয়। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধারে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহনের পুরস্কার এবং রাতারাতি বিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠার গল্প।
ছাত্র হিসেবে ছিলেন বরাবর তুখোড়। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গবেষণা বিশ^বিদ্যালয় ম্যাসাচুসেটসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এমআইটি) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে একটুও বেগ পেতে হয়নি। ২০১০ সালে ভর্তি হয়ে পদার্থবিদ্যা ও গণিতে পড়াশোনা করেন। সেখানে মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবাই চিনত তাকে। কীভাবে বিলিয়নিয়ার হওয়ার পেছনে ছুটেছেন তার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে জানান, যখন তিনি এমআইটির ছাত্রাবাসে থাকতেন তখন ছাত্রদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাই তাকে ধনী হওয়ার পথ দেখিয়েছে। ‘কার্যকর পরহিতৈষী’ আন্দোলনের সমর্থক স্যাম। তাই স্নাতক অর্জনের পর ব্যাংকে ঢুকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের বাণিজ্যিক ফার্ম জেন স্ট্রটে ব্রোকার হিসেবে কাজ করেন অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই বিরক্ত হয়ে ওঠেন। এবার বিটকয়েন নিয়ে শুরু করেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সে সময়েই স্যাম বিভিন্ন বিটকয়েনের বিনিময় মূল্যের তারতম্য লক্ষ করেন এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিটকয়েনের ব্যবসা শুরু করেন। একস্থান থেকে কত কমদামে কিনে অন্যস্থানে বেশি দামে বিক্রি শুরু করেন। এক মাসের ব্যবসা থেকে সামান্য লাভ হয়। এবার স্যাম তার কলেজজীবনের কয়েক বন্ধুকে সঙ্গে নেন। ২০১৭ সালের দিকে শুরু করেন আলমেদা রিসার্চ নামক একটি বাণিজ্যিক ব্যবসা। বেশ কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রম করার পর সীমান্ত পেরিয়ে ও ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তরের কৌশলে দক্ষতা অর্জন করেন। আর তিন মাস না যেতেই তিনি তার দল জ্যাকপটটি পেয়ে যায়।’ এভাবেই ২০১৮ সালে স্যামের প্রতিষ্ঠিান প্রতিদিন ১০-১৫ লাখ মার্কিন ডলার আয় শুরু করেন।
স্যামের বয়স তখন ত্রিশ। এরই মধ্যে উদ্যোক্তা হিসেবে ক্রিপ্টো সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ক্রপ্টো এক্সচেঞ্জ এফটিএক্স প্রতিষ্ঠা। দ্বীপরাষ্ট্র বাহামার রাজধানী নাসাউ-এ এফটিএক্স-এর সদর দপ্তর। তার নেতৃত্বে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এফটিএক্স। যার গ্রাহকসংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি। বিটকয়েনসহ সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন হতে থাকে এফটিএক্সে। দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে। এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় করেন ৩২ বিলিয়ন ডলার। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এফটিএক্স হয়ে ওঠে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ। ২০২১ সালে বিলিয়নিয়ারের তালিকায় নাম লিখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। ২০২২ সালের শুরুতে এর বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। দক্ষ উদ্যোক্তা স্যাম হয়ে ওঠেন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আদর্শ। তখন ফরচুন ম্যাগাজিন স্যামকে আগামীদিনের ওয়ারেন বাফেট হিসেবে আখ্যা দেয়।
২১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ
করোনা মহামারী চলছিল তখন । সিকুয়া ক্যাপিটাল স্যাম ফ্রাইডের কোম্পানি এফটিএক্স-এ ২১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল। আলোচনা চলে ও স্যাম তার কাক্সিক্ষত বিনিয়োগও তুলে নেন। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এ আলোচনা ও বিনিয়োগ তুলে নেওয়া বিখ্যাত কোনো হোটেলের করপোরেট মিটিংয়ের টেবিলে হয়নি। বরং স্যামের সঙ্গে সিকুয়া ক্যাপিটলের বিনিয়োগের আলোচনা চলে একটি ভিডিওকলের মাধ্যমে। যার মধ্য দিয়ে স্যাম তার পুরো বিনিয়োগ তুলে নেন। সিকুয়ার সঙ্গে স্যামের যখন ভিডিওকলে বিনিয়োগের আলোচনা চলছিল, একই সঙ্গে স্যাম তখন লিগ অব লিজেন্ডস গেমটি খেলছিলেন। ওই ভিডিও গেম খেলতে খেলতেই স্যাম বিনিয়োগকারীদের নানা প্রশ্নের উত্তর ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং একপর্যায়ে যখন কনসালটেশন কলটি শেষ হয়, তখন সিকুয়া ক্যাপিটল তার ২১০ মিলিয়ন ডলার এফটিএক্স-এ বিনিয়োগ করতে রাজি হয়ে যায়। স্যাম এতটাই তীক্ষè মেধাবী যে, এত বড় লেনদেনের একটি ইনভেস্টমেন্ট কলের মধ্যে কথা বলতে বলতে কেন তিনি গেম খেলছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস হয়নি সিকুয়া ক্যাপিটলের মতো বড় এই কোম্পানির ।
দেউলিয়া হলো যেভাবে
বাইনান্স বিশ্বের সবচেয়ে বড় কিপ্টো এক্সচেঞ্জ কোম্পানি। আর এফটিএক্স বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গড়ে উঠতে যাওয়া কিপ্টো এক্সচেঞ্জ কোম্পানি। এফটিএক্স যখন গড়ে উঠতে শুরু করে, তখন বাইনান্স স্যামের কোম্পানিটির কিছু অংশের শেয়ার কিনে নেয়। এর দুই বছরের মধ্যে দেখা যায়, এফটিএক্স এত বড় কোম্পানি হয়ে গেছে যে, তারা পরবর্তী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাইনান্সেরও ওপরে উঠে যাবে বলে মনে হচ্ছে। তাই এফটিএক্সকে সত্যিকারের প্রতিযোগী ভেবে বাইনান্স তার অবস্থান বদলায়। স্যামের কোম্পানি এফটিএক্সের কেনা আগের শেয়ার এফটিএক্সকেই ফেরত দিতে চায় এবং তার বদলে এফটিএক্সের কাছে টাকা চায়। বাইনান্স যখন এফটিএক্সের চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে তখন এফটিএক্স তাকে দুটি উপায়ে টাকা দেয়। একটি হলো বাইনান্সের স্টেবল বা স্থায়ী কয়েন বিইউএসডি এবং অপরটি হলো এফটিএক্সের স্থায়ী কয়েন এফটিটি। ডিজিটাল মুদ্রাবাজারের কিপ্টো দুনিয়ার যখন লেনদেন বা আদান-প্রদান করা হয় তখন সরাসরি ডলার দিয়ে করা হয় না। অনেক সময় ডলারের বদলে স্টেবল কয়েন দিয়ে লেনদেন করা হয়। যার মূল্য ১ ডলারের সমপরিমাণ।
মূল ঘটনাটি ঘটে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। বাইনান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চ্যাংপেং ঝাও এক টুইট করে বলেন, আমরা যখন এফটিএক্সকে আমাদের শেয়ারের অংশ ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম, তখন তার বিনিময়ে আমরা এফটিএক্সের কাছ থেকে এফটিটি টোকেন পেয়েছিলাম। এখন আমরা সেগুলো বিক্রি করে দেব। বাইনান্সের এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই কিপ্টো জগতের বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে এর গ্রাহকরা পর্যন্ত বিশ্লেষণ শুরু করে এবং দেখা যায়, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন এফটিটি টোকেন বিক্রি হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে বাইনান্সের সিইও এফটিটি আগে বিক্রি করে পরে টুইট করেছিলেন, যে আমার এফটিটি বিক্রি করে দেব। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কিপ্টোকারেন্সি বাজারে ভাইরাল হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবেই বাজারে এফটিটি টোকেনের মূল্যের পতন হয়। ঠিক একই সময়ের দিকে একটি নথি ফাঁস হয়। যেখানে দেখানো হয় যে, এফটিএক্স আগে দাবি করেছিল তাদের ব্যাংকে ১৪ বিলিয়ন ডলার আছে। কিন্তু ওই নথিতে দেখা যায় তাদের ৬ বিলিয়ন ডলার আছে। বাকি ৮ বা ৭ বিলিয়ন এফটিটি টোকেন দিয়ে ডলারের সমপরিমাণ সম্পত্তি আছে। বাস্তবে দেখা যায়, বাইনান্সের সিইও যখন এফটিটি বিক্রি করে দেয় তখন এফটিটির হঠাৎ করে দাম কমা শুরু হলো। এফটিএক্স আগের রাতে বলেছিল, তাদের অ্যাকাউন্টে ১৪ বিলিয়ন সমপরিমাণ টাকা আছে। কিন্তু পরের রাতে দেখা গেল, ওই ১৪ বিলিয়নের মধ্যে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন এরই মধ্যে নাই হয়ে গেছে। কারণ এফটিটির দরপতন হয়েছে একেবারে খাড়াখাড়িভাবে। মোটামুটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই নাটকীয় পতনের ঘটনাটি ঘটেছিল। সাধারণ বিনিময়ের ক্ষেত্রে যে চিত্র দেখা যায় এফটিএক্স ও তার কয়েন এফটিটির বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। বিনিয়োগকারী থেকে গ্রাহক পর্যন্ত সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে । তারা এফটিএক্সের দুটি ওয়েবসাইটএফটিএক্স ডট কম ও এফটিএক্স ডট ইউএসে হামলে পড়ে। এই ওয়েবসাইটে গিয়ে সবাই তাদের কিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ফেরত চায়। বিপদে পড়ে যায় এফটিএক্স ও তার প্রধান নির্বাহী স্যাম। তখন কোনো উপায় না দেখে এফটিএক্স তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয় এবং ঘোষণা দেয় যে, আপাতত কেউ টাকা তুলতে পারবে না। একটু অপেক্ষা করুন। তবে সবচেয়ে বিস্ময়ের কথা হলো, এই পুরো ঘটনাটি এক সপ্তাহ, এক মাস বা এক বছর ধরে চলেনি । এই নাটকীয় লেনদেনের ঘটনাটি ঘটেছে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। রাতারাতি এই সময়ের মধ্যে এফটিএক্সের মূল্য ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ডলার হয়ে যায় এবং বাইনান্স এবার এফটিএক্সকে কিনে নেওয়ার একটি প্রস্তাব দিয়ে কাম্পানিটি সম্পর্কে আরও পর্যালোচনা শুরু করে। এরই একপর্যায়ে তারা জানতে পারে , এফটিএক্সেও ব্যালান্স শিটের অ্যাকাউন্টিংয়ে অনেক ঘাপলা আছে। তাই তারা পিছুটান দেয়। এরই মধ্যে ডিসেম্বরের ১১ তারিখে স্যাম তার কোম্পানি এফটিএক্সকে দেউলিয়া ঘোষণা করার জন্য আবেদন জানায়।
দেউলিয়া এফটিএক্স
চারদিকে তরুণ বিলিয়নিয়ার হিসেবে স্যামের জয়জয়কার চলছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ করেই এ বছরের নভেম্বরের প্রথম দিকে এফটিএক্স আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। যার জেরে ৮ নভেম্বর এফটিএক্সের মুদ্রা এফটিটির পতন হয়। স্যামের আনুমানিক সম্পদ ছিল ১৫.২ বিলিয়ন ডলার। এফটিটির পতনে রাতারাতি স্যামের সম্পদ থেকে প্রায় ১৪.৬ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে যায়। সম্পদের পরিমাণ নেমে আসে ৯৯১.৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে ৯৪ শতাংশ সম্পদ হারান স্যাম। সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্য মতে, এটি বিলিয়নিয়ার সূচকের ইতিহাসে এক দিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। ১১ নভেম্বরের মধ্যে ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার সূচকে স্যাম ব্যাংকমান ফ্রিডের আর কোনো আর্থিক সম্পদ (ম্যাটেরিয়াল) না থাকার তথ্য জানানো হয়। বিশে^ এ পর্যন্ত এক দিনের মধ্যে একজন বিলিয়নিয়ারের এমন দেউলিয়া হওয়ার নজির নেই। অল্প সময়ের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সির শিল্পের সাড়া জাগানো প্রতিষ্ঠানটি ধসে পড়লে গ্রেপ্তারের শিকার হন তিনি। যেখানে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা তহবিলের নয়ছয়ের চেয়ে বরং তাকে হিসাবের ত্রুটির কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে মার্কিন আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার নীলনকশা করার অভিযোগ তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অভিযোগ অনুসারে, স্যামের কোম্পানি এফটিএক্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে কমপক্ষে ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ওই পরিমাণ ডলার থেকে তিনি ১.৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। এ প্রসঙ্গে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান গ্যারি গেনসলার ২২ ডিসেম্বর বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমাদের অভিযোগ, স্যাম ব্যাংকম্যান ফ্রিড প্রতারণার ভিত্তিতে তাসের ঘর তৈরি করেছিলেন। যেখানে তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ^স্ত করেছিলেন, তার প্রতিষ্ঠান কিপ্টোতে সবচেয়ে নিরাপদ ভবনগুলোর মধ্যে একটি।’
আইনের মুখোমুখি
দ্রুত গড়ে তোলা এফটিএক্সের কারণে কখনো এমন শোচনীয় পরিণতির কথা হয়তো কখনোই ভাবেননি এমআইটির একসময়ের তুখোড় ছাত্র স্যাম। তাই সংকটের মুখে স্যাম আলমেদা রিসার্চের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং এফটিএক্সের সিইওর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সেই সঙ্গে আবেদন জানান এফটিএক্সকে দেউলিয়া ঘোষণার। এক দিনের মধ্যে বিলিয়নিয়ার থেকে পথে বসে যাওয়া। এরই মধ্যে স্যামের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, এফটিএক্স এক্সচেঞ্জ থেকে ওই পরিমাণ অর্থ তিনি আলমিদায় সরিয়ে নিয়েছেন। এর বাইরে আমানতকারীদের আরও ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা এফটিএকসের এই ঘটনাকে আর্থিক খাতের আরেকটি বড় জালিয়াতির উদাহরণ হিসেবে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে সবার অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করে স্যাম বলেছিলেন, ‘আমি কোনো জালিয়াতি করিনি। একটি বড় রকমের ধসের শিকার আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান।’ আজ পর্যন্ত কোনো বিলিয়নিয়ার রাতারাতি এত সম্পদ হারাননি।
এর পরপরই তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসিসি)। ১২ ডিসেম্বর স্যামকে বাহামা থেকে ‘আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে’ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদিকে নিউ ইয়র্কের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা আদালতে স্যামের বিরুদ্ধে ১৩ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগে স্যামের বিরুদ্ধে ৮টি অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। যার মধ্যে তারবার্তা প্রতারণা, পণ্য প্রতারণা, সিকিউরিটি প্রতারণা, মানি লন্ডারিং এবং নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ আইন লঙ্ঘনসহ অপরাধের অভিযোগ পেশ করা হয়। এই ৮টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে স্যামকে ১১৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। এই কিপ্টো এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম এরই মধ্যে জালিয়াতি ও অর্থ পাচারসহ ফেডারেল অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ২২ নভেম্বর নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত তাকে জামিনে মুক্তি দেন। ২৫০ মিলিয়ন বন্ড সই করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, তাকে তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িতে থাকতে হবে। আধুনিক যুগের এই জেপি মরগান বিরুদ্ধে মামলা চলবে।