সড়ক নিরাপত্তায় শিক্ষার্থীদের সচেতনতা জরুরি

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কে চলাচল দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, অনেকে বেঁচে থাকলেও পঙ্গু হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয় জরিপে দেখা যাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার অধিকাংশই শিশু। গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ শিশু হেঁটে স্কুলে যায়। গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। নিয়ম না জানার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্র্তৃক বাস্তবায়িত ‘সেকেন্ড রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট-২ (আরটিআইপি-২) প্রকল্পভুক্ত ১৫টি জেলার ১৫টি উপজেলায় সড়ক নিরাপত্তা প্রচারাভিযান পরিচালনা করছে। এ কাজে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ব্র্যাকের কমিউনিটি রোড সেফটি প্রোগ্রাম।

এই প্রচারাভিযানে ৩৬০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় নব্বই হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কের তালিকা থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার ২৫০ কিলোমিটার সড়কসংলগ্ন বিদ্যালয়সমূহে এ প্রচারাভিযান পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রচারাভিযানটি পরিচালিত হয়।

প্রচারাভিযানের আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুশীলন মূল্যায়নের জন্য নরসিংদী ও মেলান্দহ উপজেলার শিক্ষার্থীদের ওপর ভিত্তি জরিপ পরিচালনা করা হয়। ভিত্তি জরিপের ওপর পাওয়া ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শিখন উপকরণগুলো তৈরি করা হয়; যার মধ্যে ছিলফ্লিপ চার্ট, কুইজ বুক।

ভিত্তি জরিপ থেকে জানা যায়, নরসিংদী সদরে শতকরা ৮৭ ভাগ শিক্ষার্থী হেঁটে স্কুলে যায়। মেলান্দহ উপজেলার শতকরা ৭২ ভাগ শিক্ষার্থী হেঁটে স্কুলে যায়। শতকরা ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী একা স্কুলে হেঁটে যায় এবং শতকরা ৫৮ ভাগ শিক্ষার্থী তাদের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যায়। ভিত্তি জরিপে আরও জানা যায়, ছোট রাস্তার আশপাশে দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় শতকরা ২৯ ভাগ (মেলান্দহে শতকরা ৩৪ ভাগ এবং নরসিংদী সদরে শতকরা ২৫ ভাগ) এবং প্রধান সড়কে শতকরা ২৫ ভাগ (মেলান্দহে শতকরা ২৬ ভাগ এবং নরসিংদী সদরে শতকরা ২৫ ভাগ)। গত ১২ মাসে প্রায় শতকরা ২১ ভাগ শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

প্রচারাভিযান শেষে অনুবর্তী (ফলোআপ) স্টাডিতে, নরসিংদী সদরে প্রায় শতকরা ৬৮ ভাগ শিক্ষার্থী রাস্তার ডান দিক হাঁটা নিরাপদ মনে করেছে, যা বেজলাইন সার্ভেতে ছিল শতকরা ৩৭ ভাগ। রাতে রাস্তা চলাচল প্রসঙ্গে নরসিংদী ও মেলান্দহে প্রায় শতকরা ৩৪ ভাগ শিক্ষার্থী জানত না যে এ সময় রঙিন জামা পরা ভালো, যা এখন শতকরা ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী জানে। ‘আগে আমি রাস্তার বাম পাশ দিয়ে হাঁটতাম। এখন আমি রাস্তার সঠিক দিক দিয়ে হাঁটা শিখেছি, আমি জেনেছি রাস্তার ডান দিকে হাঁটা নিরাপদ। আমি নিজে সচেতন হয়ে, আমার পরিবারের সবাইকে রাস্তায় নিরাপদে হাঁটা ও হাঁটার সময় সড়কের নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিই।’ এভাবেই সড়ক সচেতনতার কথা বলছিলেন নরসিংদী সদর উপজেলার ভাটপাড়া নগেশ চন্দ্র গুপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা হামিদ ফিজা।

অধিকাংশ শিক্ষার্থী রাস্তায় হাঁটা বা পারাপারের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়। শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার অভাবে এমন দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। সড়ক নিরাপত্তা প্রচারাভিযানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সড়কে নিরাপদে চলাচলের নিয়ম শেখানো হয়। শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে ৩৬০ জন প্রধান শিক্ষক ও ৭২০ জন সহকারী শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা বিদ্যালয়গুলোতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সেশন পরিচালনা করেন। এ প্রচারাভিযানে অংশ নেওয়া একজন ছাত্র বলে, ‘আমরা আগে জানতাম না কীভাবে রাস্তা পার হতে হয়। আমরা ছুটে যেতাম। আমাদের শিক্ষক আমাদের ডানে-বামে দেখে দ্রুত রাস্তা পার হতে শিখিয়েছেন। এবং আমরা জেনেছি রাতে রাস্তায় চলাচলের জন্য আমাদের লাইট বা হারিকেন ব্যবহার করতে হবে।’

এই প্রচারাভিযানটি এলজিইডি আওতাভুক্ত ১৫টি জেলার ১৫টি উপজেলার ‘উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটি’র কার্যক্রম গতিশীল করতে স্থানীয় সদস্যদের নিয়ে একটি বড় পরিসরের কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেখানে ৬৭৫ জন সদস্য নিয়ে ৭৫টি ‘কমিউনিটি রোড সেফটি গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফ্লিপ চার্টের মাধ্যমে তারা ছবি দেখে খুব সহজেই সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে। এই প্রকল্পের আগে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী জানত না কোন পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে কিন্তু এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তারা জানে কোন পাশ দিয়ে রাস্তায় হাঁটা নিরাপদ। রাস্তায় নারী যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়ে তারা জানতে পেরেছে। টাঙ্গাইলের ছনখোলা শেখ ফজিলাতুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. আবু বকর বলে, ‘আমরা সঠিকভাবে রাস্তা পার হতে শিখেছি। প্রথমে বাম-ডানে দেখতে হবে কোনো যানবাহন আসছে কি না। তারপর ডানে, বামে, ডানে তাকাতে হবে, যদি কোনো যানবাহন না থাকে তাহলে দ্রুত রাস্তা পার হতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কুইজ বই দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কুইজ বইয়ের মাধ্যমে তাদের অর্জিত জ্ঞান পুনরায় ঝালাই করতে পারবে। এ ছাড়া তারা তাদের পরিবারকেও সচেতন করতে পারছে। এই সড়ক নিরাপত্তা অভিযানের ফল মূল্যায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আমরা আশাবাদী সড়ক নিরাপত্তায় এ প্রচারাভিযান শিক্ষার্থীদের নিরাপদে পথ চলতে সহায়তা করবে, যা তাদের দুর্ঘটনার হাত থেকে নিশ্চিত সুরক্ষা দেবে।

লেখক : প্রকল্প পরিচালক আরটিআইপি-টু (গ্রামীণ পরিবহন উন্নয়ন প্রকল্প)