উৎসবের ভোটে ইভিএম বিড়ম্বনা

বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার বড় কোনো ঘটনা ছাড়াই হয়ে গেল রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচন। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপচেপড়া ভিড় থাকলেও ভোট গ্রহণকালে ঘটেনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা। রাতে ফলাফল ঘোষণার পর পরাজিত এক প্রার্থীর সমর্থকরা বিজিবি সদস্য বহনকারী একটি গাড়িতে আগুন দিলেও ঘটেনি কোনো হতাহতের ঘটনা। তবে ভোট দিতে হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে ভোটারদের। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ত্রুটি, আঙুলের ছাপ না মেলাসহ ভোটাররা পদ্ধতি বুঝতে না পারায় হয়েছে বিলম্ব। অনেকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ভোট না দিয়েই চলে গেছেন। আবার অনেক কেন্দ্রে সন্ধ্যা ৭টা অবধি চলেছে ভোটগ্রহণ।

এ কারণে ইভিএমের সমালোচনা করেছেন মেয়র পদের জয়ী প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ অন্যরা।

   নিজে ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়া মোস্তাফিজার ইভিএমকে অকার্যকর ব্যবস্থা হিসেবেও মন্তব্য করেছেন। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ইভিএম নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তার ভাষ্য, ভোটার বেশি উপস্থিতির কারণেই ভোটগ্রহণে বিলম্ব হয়েছে।

গতকাল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রথম দফায় টানা ভোটগ্রহণ চললেও ইভিএম বিড়ম্বনায় কোনো কোনো কেন্দ্রে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভোট নিতে হয়েছে। এ কারণে ফল ঘোষণাও বিলম্ব হয়েছে। গতকাল রাত সোয়া ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ২২৯ কেন্দ্রের সমন্বিত ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন। রংপুর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ফল ঘোষণার সময় অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

আবদুল বাতেন জানান, মেয়র পদে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমিরুজ্জামান পিয়াল হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৯২ ভোট। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী লতিফুর রহমান মিলন হাতি প্রতীকে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৮৩ ভোট। আর নৌকা প্রতীকে হোসেনে আরা লুৎফা ডালিয়া পেয়েছেন ২২ হাজার ৩০৬ ভোট।

এ ছাড়া বাংলাদেশ কংগ্রেসের আবু রায়হান ১০ হাজার ৫৪৯, জাকের পার্টির খোরশেদ আলম ৫ হাজার ৮০৯ ভোট, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুল রহমান ম-ল ২ হাজার ৮৬৪ ভোট, মেহেদী হাসান স্বতন্ত্র প্রার্থী ২ হাজার ৬৭৯ ভোট, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের শফিয়ার রহমান ৫ হাজার ১৫৬ ভোট পেয়েছেন।

এ ছাড়াও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১১ জন ও ৩৩টি ওয়ার্ডে ৩৩ জন সাধারণ কাউন্সিলর বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য মেলেনি।

রসিকের মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৬৯। এর মধ্যে গতকাল ভোট পড়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৬টি।

গতকাল সকালে শীত উপেক্ষা করে কেন্দ্রে আসতে থাকেন ভোটাররা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটের লাইন বড় হতে থাকে। দুপুরের পর বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোটারের বড় লাইন দেখা যায়। সকাল সোয়া ৯টার দিকে নগরীর আলমনগর কলেজ রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তবে তিনি ভোট দিতে যাওয়ার পরই সাময়িক অকার্যকর হয়ে যায় ইভিএম। এ সময় ইভিএমের নানা ত্রুটি নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখি ইভিএম হ্যাং হয়েছে। এই যদি ইভিএমের অবস্থা হয়, তাহলে মানুষ ভোট দেবে কীভাবে? আমরা প্রথম থেকে ইভিএম সচল রাখতে বলেছিলাম, কিন্তু রিটার্নিং অফিসার কথা শোনেননি। এ মেশিনে যে সমস্যা তা আজ প্রমাণ হয়েছে।’

এরপর ভোটকেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করছিলেন মোস্তাফিজার রহমান। আধা ঘণ্টা পর ইভিএম সচল হলে কেন্দ্রের লোকজন তাকে ডেকে নিয়ে যান। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বলেন, ‘জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’

গতকাল বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ঘুরে দেখা গেছে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। তবে বিলম্ব হওয়ার কারণে তাদের ক্ষোভও ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় ঘটেনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা। সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে, দুপুরে রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন বলেন, ‘নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুয়েকটি জায়গা থেকে ইভিএমে ভোট দিতে একটু সমস্যার কথা শোনা গেলেও কিন্তু আমরা তা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আসলে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন আর অনিয়ম ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রসহ সব ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করেছেন।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে দেখা যায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। মাঝে মাঝে কিছু ইভিএমে ত্রুটি দেখা দিলে তা তাৎক্ষণিক সমাধান করে নেন প্রিসাইডিং অফিসাররা। অনেক ভোটার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে যান।

এদিকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর লায়ন্স স্কুলে অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে যান নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া। তবে সে কেন্দ্রটিতে তিনি লাঙ্গলের কাছে বিপুল ভোটে হেরেছেন।

নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে-সিইসি : প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল দাবি করেছেন, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ব্যাপক ছিল। স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।

গতকাল ভোটগ্রহণ শেষে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ব্যালটের তুলনায় ইভিএমে ভোটগ্রহণ ধীরগতিতে হয়েছে।’ বিকেলে সিইসি বলেন, ‘যেটা কাস্ট হয়েছে ৪টা পর্যন্ত কোথাও ৬৭ শতাংশও পাচ্ছি, আবার কোথাও ৩৯ শতাংশও পাচ্ছি। অ্যাভারেজ অনুমান করছি এটা ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ এবং পরিশেষ ৬০ শতাংশের ওপরে বা কমও হতে পারে। এটা অনুমান করে বলছি। চূড়ান্ত গণনার পর দেখা যাবে কত হলো।’

তুলনামূলকভাবে ইভিএমটা ব্যালটের চেয়ে সেøা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখনো লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ধীরগতি দুটো কারণে হয়। ভোটার উপস্থিতি বেশি হলে হয়। এর ইতিবাচক দিক আছে। ইভিএমের সমস্যা সবসময় একই। এখানে ভোটার উপস্থিতি বেশি হয়েছে।’

রংপুরের ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৭০ ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ সুষ্ঠু করতে, সকাল ৮টা থেকেই আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুমে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা মনিটরিং করছিল নির্বাচন কমিশন। একে একে তিনজন নির্বাচন কমিশনারের পর কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত হন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। এ সময় বড় স্ক্রিনে ৪৪টি ওয়ার্ডের সব কেন্দ্র প্রাঙ্গণ, ভোটকক্ষের ছবি জুম করে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

রংপুরে ভোটগ্রহণ এবং ভোট দেওয়া দুটোই সুশৃঙ্খলভাবে হয়েছে মন্তব্য করে সিইসি বলেন, ‘ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ, আগ্রহ, উদ্দীপনা, আনন্দঘন পরিবেশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রথম থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সহযোগিতা করে আসছে, তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, ঘটলেও মোকাবিলা করা সম্ভব। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছে। কোনোরকম সংঘর্ষ, সংঘাত নেই। একটা জিনিস খুবই সুখকর, সেটা হচ্ছে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে সংযমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে অবস্থান করছে। এটা একটা ভালো দিক।’

জাতীয় পার্টির প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘জাপার একজনের ভোট দিতে অসুবিধা হয়েছিল, পরে ভোট দিয়েছেন। প্রার্থী তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো দিতে পারেননি, পরপরই দিতে পেরেছেন। প্রযুক্তিতে প্রবলেম হতে পারে। এখানে কিছু মেকানিক্যাল প্রবলেম হয়ে থাকতেই পারে।’