দেশের ৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও পাঁচটি পৌরসভার নির্বাচনে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ হয়েছে। এই ভোটগ্রহণ চলাকালে নোয়াখালী সদর উপজেলার নোয়াখালী ইউনিয়নে ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটারকে ইভিএমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি দেখিয়ে দেওয়ায় এক পোলিং এজেন্টকে দড়ি দিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখার অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। গতকাল দুপুরে পশ্চিম চর উড়িয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। বেঁধে রাখা মো. সেলিম এক সংরক্ষিত নারী মেম্বার প্রার্থীর (তালগাছ প্রতীক) পোলিং এজেন্ট ছিলেন। জেলার জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মেসবাহ উদ্দিন তাকে আটক করে স্কুলের পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখেন।
এদিকে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণের সময় এক প্রার্থীর স্বজনের নেতৃত্বে স্থানীয় এক সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। অন্যদিকে ইভিএম বিভ্রাটে নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় রাজশাহীর বাঘা পৌর নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে সন্ধ্যার পরও।
নোয়াখালীতে পোলিং এজেন্টকে দড়ি দিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখার বিষয়ে জানা গেছে, নোয়াখালী ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার পদে তালগাছ প্রতীকের প্রার্থী জোসনা বেগমের হয়ে পশ্চিম চরউড়িয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন মো.সেলিম। এক নারী ভোটারকে ইভিএম- এ ভোট দেওয়ার পদ্ধতি দেখিয়ে দেওয়ার অভিযোগে জেলার জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মেসবাহ উদ্দিন তাকে স্কুল ভবনের পাকা পিলারের সঙ্গে রোদের মধ্যে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী মো. সেলিমকে দীর্ঘক্ষণ বেঁধে রাখা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মো. মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘অনিয়ম করার কারণে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যাতে অন্যরাও সতর্ক হয়।’
দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা মো. সেলিম বলেন, ‘একজন লোক বলছে সে ইভিএম বোঝে না, আমি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছি। এটা কি আমার অপরাধ? যদি সাহায্যই না করতে পারি তাহলে ওখানে বসে থেকে আমার কী লাভ? এটা আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। ওদের ক্ষমতা আছে, ওরা ক্ষমতা দেখিয়েছে।’
তালগাছ প্রতীকের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার প্রার্থী জোসনা বেগম বলেন, ‘সব বুথে এভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে। এটা ভোটারদের সুবিধার জন্য। কিন্তু একটা মানুষকে এভাবে বেঁধে রাখার কোনো মানে হয় না। আমি অনেকবার বলেছি, আমার কথা শুনে নাই নির্বাচন কর্মকর্তা।’
কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমাকে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ বলেছেন বাঁধন খুলে দিতে। আমি খুলে দিচ্ছি।’
পোলিং এজেন্টকে ৬ মাসের কারাদণ্ড : নোয়খালী সদর উপজেলার ৩ নম্বর নোয়ান্নই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শিবপুর মুসলিম হাই স্কুল কেন্দ্রে ভোট প্রদানে অনিয়মের অভিযোগে সুমি আক্তার নামে এক নারী পোলিং এজেন্টকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। অন্যদিকে ভোটগ্রহণ ও প্রদানে অনিয়মের অভিযোগে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার মো. আলী হোসেনকে (৪৮) দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ভোটকেন্দ্রের সামনে সাংবাদিকের ওপর হামলা : ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে আনারস মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী সুমন আহমেদ ভূঁইয়ার বোন জামাই রুবেল আহমেদের নেতৃত্বে এক সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার আলহাজ আবু তালেব মোল্লা স্কুল ভোটকেন্দ্রের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, প্রায় ৪০-৫০ জন মিলে আশুলিয়া এক্সপ্রেসের বার্তা সম্পাদক ও জুমবাংলার সাভার প্রতিনিধি হাসান ভূঁইয়াকে রাস্তা থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে তারা তাকে রাস্তার পাশের একটি গলির ভেতরে নিয়ে যায়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে সাংবাদিক হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের উপনির্বাচনের তথ্য সংগ্রহের জন্য জামগড়া এলাকার আলহাজ আবু তালেব মোল্লা স্কুল ভোটকেন্দ্রের সামনে গেলে হঠাৎ করে আনারস মার্কার প্রার্থী সুমন আহমেদ ভূঁইয়ার বোন জামাই রুবেল আহমেদসহ ৪০-৫০ জন আমার সামনে আসে। আমি সাংবাদিক পরিচয় দিলে তারা আমাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে মারতে টেনেহিঁচড়ে পাশেই থাকা একটি বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। পরে ওই বাড়ির ভেতরে আটকে থাকা অবস্থায়ও আমাকে ওরা এলোপাতাড়ি মারধর করে।’
এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানার এসআই মাসুদ আল মামুন বলেন, ‘আমি আলহাজ আবু তালেব মোল্লা স্কুল ভোটকেন্দ্রের সামনের রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ ডিউটি করতেছিলাম। এমন সময় দেখতে পেলাম সাংবাদিক হাসান ভূঁইয়াকে কয়েকজন লোক টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে আমি তাদের কাছ থেকে হাসান ভূঁইয়াকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেই।’
বাঘায় সন্ধ্যার পরেও ভোটগ্রহণ: নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় রাজশাহীর বাঘা পৌর নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে সন্ধ্যার পরও। ইভিএমে ভোটগ্রহণে সময় লাগায় নির্ধারিত সময়ে ভোটগ্রহণ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন অনেকেই। আঙুলের ছাপ না মেলায় তারা ভোট দিতে পারেননি। বাঘা পৌরসভা নির্বাচনের ১১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয় গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায়। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট চলার কথা ছিল। কিন্তু বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের পরেও ভোট নেওয়া শেষ করা যায়নি। বিকেল সাড়ে ৫টার সময়ও শতশত ভোটার কেন্দ্রের বাইরে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন। ফলে অনেক কেন্দ্রে সন্ধ্যার পরেও ভোটগ্রহণ করা হয়। এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট দিতে না পেরে ফিরে যেতে দেখা গেছে বেশকিছু ভোটারকে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহীর জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবুল হোসেন বলেন, ‘কিছু কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের পরেও ভোট নেওয়া হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যারা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করেছেন তাদের ভোট নেওয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণে সময় লাগায় কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট শেষ করতে কিছুটা সময় লেগেছে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধি