ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলাকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহর সেজেছে নতুন রূপে। চারদিকের লাল, নীল, হলুদ বাতির আলোকছটা যেন আনন্দের রঙিন আভা বয়ে আনছে। কিন্তু আনন্দের সেই আবহ অনেকটাই মøান হয়ে যাচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে (বাইপাস) সড়কে নিত্যদিনের যানজটের কারণে। আগে থেকেই বাণিজ্যমেলা ঘিরে এশিয়ান বাইপাস সড়কে যানজটের আশঙ্কা করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা। তাদের সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। গত পয়লা জানুয়ারি মেলা উদ্বোধনের দিন থেকেই এশিয়ান বাইপাস সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
মেলায় আসা গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কাঞ্চন ব্রিজে টোল আদায়ে ধীর গতি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং ফিটনেসবিহীন লক্কল ঝক্কর গাড়ি বাইপাস সড়কে কারণে যানজটের অন্যতম কারণ বলে ভুক্তভোগীরা জানান। তবে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে ৩০০ ফুট সড়ক হয়ে মেলা পর্যন্ত রাস্তায় তেমন একটা যানজট দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাণিজ্যমেলা ঘিরে এশিয়ান বাইপাস সড়কে গাড়ি চলাচলের সংখ্যা বেড়েছে। অতিরিক্ত গাড়ির চাপ থাকায় চালকরা নিয়ম ভেঙে খেয়াল-খুশিমতো গাড়ি চালাচ্ছেন। কাঞ্চন ব্রিজ থেকে ভুলতা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তায় জায়গায় জায়গায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। কাঞ্চন ব্রিজ, চাঁন টেক্সটাইল, কালাদী ও নলপাথরসহ পুরো বাইপাস সড়কে যানবাহনের জটলা বেঁধে থাকছে। যানজটের কারণে চালকরা গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে থাকছেন। এতে যাত্রীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। যানজটে আটকা পড়ে থাকতে দেখা যায় রোগীবাহী অ্যাম্বোলেন্সও। এছাড়া চার লেনে উন্নীতের কাজ চলায় সড়কটির চারপাশ ধুলায় ছেয়ে থাকছে। এমন পরিস্থিতিতে মেলার দিকে রওনা হওয়া কাউকে কাউকে বাড়ি ফিরে যেতে দেখা যায়। হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের যথাযথ তৎপরতার অভাবে যানজট তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নরসিংদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, সিলেট ও নারায়ণগঞ্জসহ পূর্বাঞ্চল এলাকার বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে মেলায় আসতে গেলে এশিয়ান হাইওয়ে (বাইপাস) সড়ক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু মেলার সামনের কাঞ্চন ব্রিজ থেকে ভুলতা হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং ভুলতা থেকে মদনপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস সড়কটি প্রশস্ত একেবারেই কম। সড়কটি প্রশস্তকরণসহ নানা উন্নয়নকাজ চলছে। আর এই কাজে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে। চলছে সড়কের দুই পাশে মাটি কাটার কাজ। এর ওপর ফিটনেসবিহীন ও লক্কর ঝক্কর গাড়ি চলাচলের কারণে তা প্রায় সময়ই নষ্ট হয়ে অচল পড়ে থাকায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো জায়গায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া মেলাকে কেন্দ্র করে যানবাহন চলাচল বেড়েছে। অতিরিক্ত যানবাহনের পাশাপাশি কাঞ্চন ব্রিজে টোল আদায়ে ধীরগতির কারণে মুহূর্তের মধ্যেই শতশত গাড়ি জমে যাচ্ছে। এছাড়া সড়কটি দিয়ে কাঞ্চন ব্রিজ হয়ে গাজীপুর ও ময়মনসিংহসহ উত্তরবঙ্গের মালবাহী অনেক ট্রাক চলাচল করছে। এসব ট্রাকের কারণেও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন রূপসী-কাঞ্চন সড়ককে বিকল্প রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করতে বললেও তা কাজে আসছে না। অন্যদিকে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে মেলা পর্যন্ত সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। যে কারণে ওই এলাকার মানুষও মেলায় আসতে যানজটের ভোগান্তিতে পড়ছেন।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে গতকাল বুধবার কথা হয় রূপসী এলাকা থেকে মেলায় যাওয়া দর্শনার্থী ইমাদ আকাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিনই মেলায় এসে যানজটে পড়েছিলাম। আজ তৃতীয় দিনে পরিবার পরিজন নিয়ে মেলায় এসেছিলাম। বাড়ি ফেরার পথে যানজটের কারণে অনেক দেরি হয়ে গেল। আজও কাঞ্চন ব্রিজের পূর্বপাড়ে প্রায় দুই ঘণ্টা যানজটের মধ্যে বসে ছিলাম।’
কথা হয় ভুলতা এলাকা থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী সাইদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভুলতা থেকে বিকেল ৩টার দিকে বিআরটিসি বাসে উঠেছি। মেলায় পৌঁছেছি সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে। যানজটে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছি, তাই আর মেলায় বেশি ঘুরতে পারিনি।’
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে মেলায় ঘুরতে আসা জাকির হোসেন বলেন, ‘স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছিলাম। কিন্তু যানজটের কারণে আমার ছোট মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাই ফিরে যাচ্ছি বাড়িতে। এশিয়ান সড়কে প্রতিদিনই যানজট লেগেই থাকে। এ কারণে সাধারণ মানুষকে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ট্রাফিক পুলিশ যদি একটু নজরদারি বাড়িয়ে দেয় তাহলে আর যানজট থাকত না।’
তবে ট্রাফিক পুলিশের দাবি যানজট নিরসনে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে ভুলতা হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, ‘যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তবে যানজট দূর করতে হলে চালকদেরও অনেক সচেতন হতে হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব ইফতেখার আহম্মেদ চৈাধুরী বলেন, ‘মেলার প্রথম দিকে কিছুটা যানজট থাকবেই। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মেলা সফলভাবে সম্পন্ন করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’