পাবনার ঈশ্বরদীতে যুবলীগ কর্মীর গুলিতে রিকশাচালক নিহতের ঘটনায় ওই যুবলীগ কর্মীর ছেলে ও পৌর কাউন্সিলর বড় ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। তবে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা পরও গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। এদিকে গুলি করা ওই যুবলীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে গতকাল বিকেলে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন নিহত রিকশাচালকের স্বজনরা।
এর আগে গত বুধবার রাতে শহরের বিমানবন্দর সড়কের পশ্চিম টেংরি কড়ইতলা এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রিকশাচালক মামুন হোসেন (২৫) শহরের পিয়ারাখানী জামতলা এলাকার মানিক হোসেনের ছেলে। এ ঘটনায় গুলিতে একই এলাকার শরিফ হোসেনের ছেলে রিকশাচালক রকি (২৬) এবং ছুরিকাঘাতে ওই এলাকার বাবু হোসেন ওরফে বরকি বাবুর ছেলে সুমন (২৮) আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঈশ্বরদী ইপিজেড থেকে ছেড়ে আসা একটি ভটভটি ও লেগুনা বেপরোয়া গতিতে চলছিল। তাদের গতি কমাতে বলেন কড়ইতলার দোকানি ও স্থানীয়রা। এ নিয়ে লেগুনা চালকের সঙ্গে উপস্থিত দোকানি ও রিকশাচালকদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জেরে লেগুনাচালকের পক্ষে ঈশ্বরদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামাল উদ্দিন কামালের ছোট ভাই আনোয়ার উদ্দিন তিন-চারটি মোটরসাইকেলে দলবল নিয়ে এসে ওই দোকানি ও রিকশাচালকদের ওপর চড়াও হন। এতে উভয়পক্ষে তর্কাতর্কি ও হাতাহাতি হয়। কড়ইতলা থেকে কাচারিপাড়া মসজিদ মোড় পর্যন্ত মারামারি ও ধাওয়া পাল্টাধাওয়া হয়। একপর্যায়ে আনোয়ার উদ্দিন পিস্তল বের করে রিকশাচালক মামুন ও রকি হোসেনকে গুলি করেন। এতে মামুন লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। পরে আনোয়ারের সঙ্গীরা সুমনকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত
চিকিৎসক মামুন হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। আর তখন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত চিকিৎসক রহিমা ফেরদৌস আহতদের অবস্থা ভালো না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরে তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় পাঠানো হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
এদিকে রিকশাচালককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় যুবলীগ কর্মী আনোয়ার উদ্দিনের বড় ভাই ও তার ছেলেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বুধবার গভীর রাতে আনোয়ারের বড় ভাই যুবলীগ নেতা ও ঈশ্বরদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামাল উদ্দিন কামাল এবং আনোয়ারের ছেলে হৃদয় হোসেনকে তাদের শৈলপাড়ার বাড়ি থেকে ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক’ আটক করে নিয়ে গেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
কাউন্সিলর কামাল উদ্দিনের স্ত্রী শারমিন সুলতানা স্বপ্না বলেন, ‘বুধবার গভীর রাতে সিভিল পোশাকে কিছু লোক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আমাদের বাসায় আসে। তাদের সঙ্গে পোশাক পরা পুলিশও ছিল। তারা আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে চলে গেছে। সেই সঙ্গে হৃদয়কেও ধরে নিয়ে যায় তারা। কী কারণে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেটাও বলেনি তারা।’
তবে ঈশ্বরদী থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা ওই দুজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এ প্রসঙ্গে ঈশ্বরদী থানার ওসি অরবিন্দ সরকার বলেন, ‘আমার জানামতে ঈশ্বরদী থানা পুলিশ কাউকে আটক করেনি।’
পাবনা জেলা ডিবি পুলিশের দাবি, রিকশাচালক খুনের পর ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের দল টহল দিয়েছে, কিন্তু কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করেনি। তবে তারা অভিযুক্ত আনোয়ারকে খুঁজতে তাদের বাড়ি গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ময়নাতদন্তের পর থানা চত্বরে লাশ রেখে বিক্ষোভ করেন নিহত মামুনের স্বজনরা। তারা থানার ভেতর ও থানার প্রধান ফটকের সামনে কাউন্সিলর কামাল ও তার ভাই আনোয়ারের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড দাবি করে বিভিন্ন সে্লাগান দেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ওসি অরবিন্দ সরকার বলেন, ‘ময়নাতদন্ত শেষে নিহত মামুনের লাশ দাফন করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’