ছুটির দিনে দর্শনার্থী বাড়ায় ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা মানেই যেন ক্রেতা-দর্শনার্থীতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ মেলা প্রাঙ্গণ। দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকবে পুরো মেলা। স্টলগুলোর সামনে থাকবে ক্রেতাদের ভিড়। তবে গত পহেলা জানুয়ারি উদ্বোধনের পর স্টল নির্মাণকাজ শেষ না হওয়াসহ নানা জটিলতায় জমে উঠছিল না পূর্বাচল উপশহরের বঙ্গবন্ধু-চায়না বাংলাদেশ এক্সিবিশন সেন্টারে বসা মেলার ২৭তম এই আসর। তবে অবশেষে শুরুর ষষ্ঠ দিনে এসে স্টল নির্মাণকাজ শেষ হয়ে সরকারি ছুটির দিন গতকাল শুক্রবার বাণিজ্যমেলা ফিরেছে তার চিরচেনা রূপে। গতকাল বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো মেলা প্রাঙ্গণে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়।

এদিকে হঠাৎই বেশি লোকের সমাগমের কারণে মেলা থেকে তিনশ ফুট সড়ক এবং গাজীপুর বাইপাস সড়কে প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে তীব্র শীতের মধ্যে মেলায় এসে ভোগান্তিতে পড়তে হয় দর্শনার্থীদের। তবে ভোগান্তি পেরিয়েও মেলায় আসতে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকেই দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করেন মেলায়। শুরুর পাঁচ দিন পর মেলার ৩৩১টি স্টলের সবটির নির্মাণকাজও শেষ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সরকারি ছুটির দিনকে সামনে রেখে তাড়াহুড়ো করে সব স্টলের নির্মাণকাজ শেষ করতে সক্ষম হয়েছেন। সবকটি দোকানের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় মেলা ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ। আর সেই চিরচেনা রূপকে পূর্ণতা দিয়েছে মেলায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। মেলায় প্রতিটি স্টলকে সাজানো হয়েছে নানা রংয়ের বৈদ্যুতিক বাতির মাধ্যমে। পাশাপাশি ক্রেতা আকর্ষণের জন্য দোকানগুলো সাজানো হয়েছে হরেক রকমে। আবার বেশকিছু স্টলের সামনে কর্মীদের টেডি বিয়ারের পোশাক পরে দর্শনার্থীদের আনন্দ দিতে দেখা গেছে। ছুটির দিন হওয়ার কারণে গতকাল অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় ঘুরতে আসেন। ঘোরার পাশাপাশি কেনাকাটাও করেছেন অনেকেই। তীব্র শীতের কারণে শীতের পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতার সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে। গৃহস্থালি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানগুলোতেও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মেলায় ব্যবসায়ীদের দেখা গেছে ব্যস্ত সময় পার করতে। ক্রেতারাও জিনিসপত্র কিনেছেন পছন্দমতো। দামাদামি করে তাদের জিনিসপত্র কিনতে দেখা যায়। কেউ কেউ আবার পছন্দের জিনিসটি দেখে যান, পরে এসে কেনার আশায়।

হঠাৎই বেশি লোক সমাগম হওয়ায় মেলা থেকে এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে করে মেলায় আসতে ও মেলা থেকে ফিরতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, মেলায় আসতে গিয়ে প্রচণ্ড ধুলাবালি, যানজট ও পরিবহন ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নরসিংদী, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মেলায় আসার প্রধান সড়ক এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস প্রশস্তের কাজ চলছে। এ কারণেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে দর্শনার্থীদের। যানজটের কারণে এক ঘণ্টার পথে সময় লাগছে তিন ঘণ্টা।

নতুন চমক হিসেবে মেলার এই আসরে শিশুদের জন্য অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছে শিশুপার্ক। যেখানে ফ্লিপার, নাগরদোলা, ওয়ার বল ও ট্রেনসহ প্রায় ১০টি রাইড রয়েছে। পার্কের বিভিন্ন রাইডে সন্তানদের ওঠাতে দেখা যায় অভিভাবকদের। শিশু-কিশোররাও খুব আনন্দের সঙ্গে বিভিন্ন রাইড উপভোগ করে। তবে শিশুদের রাইডের টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি বলে অভিযোগ করেন দর্শনার্থীরা।

মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানান, শুরুর পাঁচ দিন পর সব দোকানপাট নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় জমে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। প্রথম দিন থেকে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় তেমন দর্শনার্থী হচ্ছিল না, তাই বিক্রিও ভালো ছিল না। ব্যবসায়ীরা এক প্রকার অলস সময় পার করছিলেন। যে কারণে ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটছিল না। অবশেষে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমনে গতকাল হাসি ফোটে ব্যবসায়ীদের মুখে। সকাল থেকেই বেচাবিক্রি বেশ ভালো ছিল। ব্যবসায়ীদের যেন দম ফেলার সুযোগই ছিল না। গতকাল বিক্রি ভালো হওয়ায় ব্যবসায়ীদের হতাশা কিছুটা হলেও নিরসন হয়েছে।

এই প্রতিবেদকের কথা হয় ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী সুমনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় আজ (গতকাল) দর্শনার্থীদের অনেক ভিড় হয়েছে। যা গত এক সপ্তাহের দর্শনার্থীদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই কদিন মেলা প্রাঙ্গণ প্রস্তুত না হওয়ার কারণে ক্রেতারা জিনিসপত্র কিনতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তবে আজ বিক্রি অনেক ভালো হচ্ছে। মেলা পুরো জমে ওঠার কারণে ব্যবসায়ীরা অনেক খুশি। দিন যত বাড়বে, মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থী তত বাড়বে বলে আশা করছি।’

একটি কসমেটিস দোকানের বিক্রয়কর্মী নাদিয়া আক্তার বলেন, ‘ছুটির দিন হওয়ায় বিক্রি হচ্ছে অনেক। নারীরা নিজেদের পছন্দমতো কসমেটিকসামগ্রী কিনছেন। গত এক সপ্তাহের মধ্যে আজই খুব ভিড় দেখছি। একদিকে শুক্রবার ছুটির দিন, অপরদিকে মেলার সব স্টল নির্মাণ শেষ হয়ে গেছে। এসব কারণেই মেলায় দর্শনার্থীর পাশাপাশি ক্রেতাও বেড়েছে অনেক।’

বিক্রি বাড়ার তথ্য জানান ক্লাসিক হোমটেক্সের ব্যবস্থাপক ইয়ামিন। তিনি বলেন, ‘আমরা মেলায় বিছানা, চাদর, কম্বলসহ বেশকিছু পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছি। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই মেলায় দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করেছে।’

মেলায় কথা হয় দর্শনার্থী পলক ও মাইসা নামে এক দম্পতির সঙ্গে। তারা জানান, দুজনই একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকরিজীবী। ছুটির দিন, তাই মেলায় ঘুরতে এসেছিলেন। কেনাকাটার পাশাপাশি খাবারের দোকানে খাওয়াদাওয়া করেন। তবে মেলায় আসার পথে যানজটের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তারপরও মেলা প্রাঙ্গণ পুরো প্রস্তুত হয়ে যাওয়ায় ভালো লেগেছে।  

মেলায় কথা হয় একটি রেস্টুরেন্টের কর্মচারী সাদ্দামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মেলা চালু হওয়ার পর আজই ছিল সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের সমাগম। খাবার দোকানগুলোতেও হয়েছে প্রচুর বেচাকেনা। এভাবে দর্শনার্থী ও ক্রেতা সমাগমে খুশি ব্যবসায়ীরা।’

রূপগঞ্জ থানার ওসি এএফএম সায়েদ জানান, মেলায় আসা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন।

মেলার আয়োজনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব ও বাণিজ্যমেলার পরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আগেই বলেছিলাম শুক্রবার থেকে বাণিজ্যমেলা জমে উঠবে। সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে। এতে করে জমে উঠেছে পুরো মেলা।’