বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন, বিরোধী পক্ষের প্রতি সরকার পক্ষের আচরণ এবং মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ‘তিক্ত সম্পর্কের’ সমাপ্তি চায় বাংলাদেশ। এক বছর ধরে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের পর গত এক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশটি বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয় তা চায়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ২/৩ বছর ধরে এসব ইস্যুতে ঢাকার ওপর ওয়াশিংটন ক্ষিপ্ত থাকলেও ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে টানাপড়েন স্পষ্ট হয়। এ নিয়ে সরকার নানা সমালোচনার মুখে পড়ে। তবে এক বছর ধরে চেষ্টার পর গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারপ্রধান ও সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডগুলো যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর পাশাপাশি র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার ইস্যু, বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সরকারের আচরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। এর মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমলে নিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
অবাধ নির্বাচন আয়োজনে বাংলাদেশ সরকার কীভাবে কাজ করছে সেটি যে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এমনটা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস। ওয়াশিংটনে ফরেন প্রেস সেন্টারে গত শুক্রবার এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে হাজির হন তিনি। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার করেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র। শুধু তাই নয়, ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কার্যক্রমে রীতিমতো সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বাহবাও দিয়েছেন তিনি।
বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নেড প্রাইস বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান। আমরা এই চাওয়াকে স্বাগত জানাই। নির্বাচন আয়োজন করতে বাংলাদেশ সরকার কীভাবে কাজ করবে তা বুঝতে আমাদের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে। এই নির্বাচন হতে হবে প্রকৃত, স্বচ্ছ এবং শান্তিপূর্ণ। যদিও নির্বাচনের এখনো আরও অনেক দিন বাকি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক বছরের তুলনায় সম্প্রতি ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক ইতিবাচক মোড় নিচ্ছে বলেই মনে হয়। বাইডেন প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের সিরিজ সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে ঢাকা। দেশটির সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে, যেটিকে শুধু এক নিষেধাজ্ঞায় ফেলে হিসাব করা ঠিক হবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চার দিনের সফরে আজ (গতকাল) ঢাকা আসার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা (বিশেষ সহকারী) এবং হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল আইলিন লাউবাচারের। দুই দিনের সফরে আগামী ১৪ জানুয়ারি আসতে পারেন দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু।
ওই কর্মকর্তা আশাবাদ জানিয়ে বলেন, এই দুজনের সফরে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের টানাপড়েন কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হবে। এ সফরে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ও সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়াও রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তারা।
তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা উভয় নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বৈঠকে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পাশাপাশি শ্রম অধিকার, দরপত্র প্রতিযোগিতায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জিএসপি পুনর্বহাল, শান্তিরক্ষা ও প্রতিষ্ঠা, প্রতিরক্ষা, জলবায়ু, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশেষ গুরুত্ব দেবে ঢাকা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনও যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিনিধির সফর সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। তাদের সঙ্গে আমাদের নীতিগত অনেক মিলও রয়েছে। আমেরিকা যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আমাদের দেশে গণতন্ত্র বিরাজমান। তারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় আর আমাদের দেশের ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে শুধু মানবাধিকার অর্জনের জন্য।
আইলিন লাউবাচারের সফরকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করি তার এ সফরের মধ্য দিয়ে আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের আরও উন্নতি হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো দেশের নির্বাচন পদ্ধতি সেই দেশই ঠিক করে। কেউ তো সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই সেই কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনেই বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবে। আর কোনো দেশ পর্যবেক্ষণ করতেই পারে। আর আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিনিধিরা সিরিজ সফর করছেন। এর ফলে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হওয়ার সুযোগই বেশি।’