স্বেচ্ছাসেবীদের টাকা কর্মকর্তার পকেটে

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুপ্রভা রানী এবং ইপিআই টেকনিশিয়ান আবদুর রশীদের বিরুদ্ধে করোনার টিকাদানকারী স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মানীর টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এক বছর শ্রম দেওয়ার পর ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবীর জন্য গত বছরের ৩০ জুন ৮ লাখ বরাদ্দ পায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেই টাকা দ্রুততার সঙ্গে পরদিনই উত্তোলন করা হলেও এখনো তা হাতে পাননি অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবী। তারা এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ দিলেও মেলেনি কোনো প্রতিকার।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের সম্মানীর টাকা পকেটে ভরেছেন সুপ্রভা রানী ও আবদুর রশীদ। স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে টাকা না পৌঁছানোর অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুপ্রভা রানী। তবে তার দাবি, ইপিআই টেকনিশিয়ান আবদুর রশীদ স্বেচ্ছাসেবীদের তালিকা না দেওয়ায় তাদের টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু সরকারি টাকা দীর্ঘদিন ধরে নিজের কাছে রাখার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

জানা গেছে, করোনাকালে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়। প্রতিটি দলে তিনজন করে পাঁচটি দলে মোট ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন তখন। সে সময় তাদের জনপ্রতি ৩৫০ টাকা করে সম্মানী দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। এক বছর শ্রম দেওয়ার পর এসব স্বেচ্ছাসেবীর জন্য গত বছরের ৩০ জুন ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। পরদিনই বিল আকারে সেই টাকা উত্তোলনও করা হয়। কিন্তু দেওয়া হয়নি স্বেচ্ছাসেবকদের।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একাধিক স্বেচ্ছাসেবক আক্ষেপ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা করোনা মহামারীর সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে টিকা দেওয়ার কাজ করেছেন। অথচ তাদের প্রাপ্য সম্মানী আজও বুঝে পাননি। বাধ্য হয়ে বিষয়টি অভিযোগ আকারে ইউএনওকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাংনীর ইউএনও মৌসুমী খানম বলেন, স্বেচ্ছাসেবকরা বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন। কিন্তু কাজের চাপে তিনি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

স্বেচ্ছাসেবীদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইপিআই টেকনিশিয়ান আবদুর রশীদ বলেন, ‘গত বছরের ৩০ জুন রাতে হঠাৎ করে স্বেচ্ছাসেবীদের নামের তালিকা চাওয়া হয়। ওইদিন স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা প্রস্তুত করে পরের দিন টাকা উত্তোলন করা হয়। সেই টাকা বিতরণের সময় অনেক স্বেচ্ছাসেবকই অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রাপ্য কিছু টাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুপ্রভা রানী নিজের কাছে রাখেন।’

ওই টাকা গ্রহণের রসিদ চাওয়া হলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তা না দিয়ে চাপের মুখে টাকাগুলো নিয়ে নেন দাবি করে আবদুর রশীদ আরও বলেন, ‘টাকা প্রদানের সময় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে টাকা গ্রহণের রসিদ দিতে বলা হলে তিনি রসিদ প্রদান ছাড়াই চাপ প্রয়োগ করে সেই টাকা গ্রহণ করেন। তিনি অফিসে ডেকে বলেন, ‘আপনার কাছে বিতরণ হয়নি এমন ৮ লাখ টাকা আমাকে দিয়ে দিন।’ উপর্যুপরি চাপের কারণে আমি সেই টাকা তাকে দিতে বাধ্য হই।’ তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চাইলেই রসিদ ছাড়া তাকে টাকা দেওয়া বিধিসম্মত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

তবে স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে টাকা না পৌঁছানোর জন্য উল্টো আবদুর রশীদের গাফিলতি রয়েছে বলে দাবি করেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুপ্রভা রানী। তিনি মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইপিআই টেকনিশিয়ান আবদুর রশীদ স্বেচ্ছাসেবীদের তালিকা না দিলে আমি টাকা কীভাবে দেব? আপনারা তাকে ধরতে পারছেন না কেন? তাকে বলুন স্বেচ্ছাসেবীদের আমার কাছে পাঠাতে।’ তবে এভাবে সরকারি বরাদ্দের বড় অঙ্কের টাকা নিজের কাছে রাখা বিধিসম্মত কিনা জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়েই ফোন সংযোগ বিছিন্ন করে দেন তিনি।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলার সিভিল সার্জন ডা. জওয়াহেরুল আনাম সিদ্দিকী বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবীদের টাকা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। সরকারি টাকা এভাবে নিজের কাছে রাখা বেআইনি। তদন্তসাপেক্ষে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’