শিমের জন্য বিখ্যাত চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড। এখানের বেশিরভাগ জমিতে বছরের এ সময়ে প্রচুর শিমের চাষ হয়। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে অতিরিক্ত কুয়াশায় কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কুয়াশা বেশি পড়লে শিমের ফুলে পোকার উপদ্রব বেড়ে যায় এবং ফুল ঝরে যায় বলে জানান সীতাকুন্ডের ইদুলপুর গ্রামের মোহাম্মদ মামুন। ৪৫ বছর বয়সী মামুন গত ১২ বছর ধরে শিম চাষ করে আসছেন। কৃষক মামুনের এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের কথায়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোট শিশুরা যেমন অতিরিক্ত শীতে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, ঠিক তেমনিভাবে বেশি কুয়াশায় বীজতলার চারাগুলো এবং যেসব সবজিতে ফুল এসেছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ভিদগুলোর বৃদ্ধিও থমকে যায়। শুধু তাই নয়, শীতকালীন ফসলগুলোতে পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়ে যায়।
অবশ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের বীজতলার চারার বয়স এখন ২৫-৩০ দিন হয়েছে। অনেক জায়গায় চারা রোপণ শুরু হয়েছে। এই পর্যায়ে ক্ষতির মাত্রা খুবই কম। হয় না বললেই চলে। যেসব চারা মাঠে আছে সেগুলো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আমরা নিজেরাই মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করছি। এখন পর্যন্ত ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরেই ঘন কুয়াশায় বেড়েছে শীতের তীব্রতা। কোনো কোনো এলাকায় গতকাল রোদের দেখা মিলেছে চার-পাঁচ দিন পর। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল সামান্য। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা ছিল জবুুথবু। কুয়াশায় ঢাকা ছিল আকাশ। যা মানুষের স্বাস্থ্যসহ ফল-ফসলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে।
কুয়াশা বাড়ার সঙ্গে পোকামাকড়ের উপদ্রবের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা উইং-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ দাউদ হোসেন বলেন, ‘কুয়াশা কখনো কৃষির জন্য ভালো নয়। রোদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া কৃষির জন্য সবচেয়ে উপকারী। বেশি কুয়াশা পড়লে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায় এবং সব গাছের ফুলের মধ্যে এর প্রভাব পড়ে। আমগাছের মুকুল, শিমগাছের ফুল কিংবা অন্যান্য ফসলের ফুলে পোকামাকড়ের বসত গড়ে ওঠে। তখন কীটনাশক বেশি পরিমাণে স্প্রে করতে হয়।’
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ভারতের দিল্লি থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত পুরো আকাশজুড়ে কুয়াশার চাদর রয়েছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে প্রায় ৪০০ মিটার পর্যন্ত এই কুয়াশার স্তরের কারণে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে প্রবেশ করতে পারছে না। আর এতে সারা দেশে তীব্র শীত অনুভবের পাশাপাশি ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে। কিন্তু এই ঘন কুয়াশার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য জোগানদাতা কৃষিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে বাতাসের আর্দ্রতা একটি অন্যতম ফ্যাক্টর। এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হচ্ছে। সূর্যের আলো প্রবেশ করতে না পারলে বাতাসে আর্দ্রতা কমবে না।’
কিন্তু আবহাওয়া নিয়ে আপাতত কোনো সুসংবাদ নেই বলে জানালেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং বিভাগের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদিন পর শীতের তীব্রতা আরও বাড়বে। তবে আজ ও কাল মঙ্গলবার সূর্যের আলো কিছুটা বাড়তে পারে।’
কিন্তু এভাবে কুয়াশা দীর্ঘায়িত হলে কৃষির উদ্ভিদগুলোর বৃদ্ধি কমে আসবে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের ট্রেনিং অফিসার নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘শীতকালে এক বা দুই দিন কুয়াশা পড়বে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ঘন কুয়াশা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে বোরো ধানের বীজতলাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একেকটি চারা চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হওয়ার কথা থাকলেও কুয়াশা বেশি পড়লে এসব চারার বৃদ্ধি থমকে যায়। তখন এগুলোর মধ্যে এক ধরনের লালচে দাগ আসে। এসব চারা থেকে পরবর্তী সময়ে ফলনে গিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’
শুধু বীজতলা নয়, সব ধরনের চারার ক্ষেত্রে এজন্য গ্রামাঞ্চলে পলিথিন দিয়ে ঢাকনা দিয়ে রাখা হয় বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কুয়াশা চারার মধ্যে পড়লে এগুলো বড় হতে পারে না। এছাড়া চারাগুলোকে সুস্থ রাখতে গভীর নলকূপের পানি চারার গোড়ায় দিনে দেওয়া হয়ে থাকে।’
উল্লেখ্য, মৌসুমের এ সময়ে মাঠে শীতকালীন ফসল আলু, টমেটো, বেগুন, মরিচ, সরিষা, শিমসহ বিভিন্ন জাতের সবজি রয়েছে। এছাড়া কোথাও কোথাও বোরোর বীজতলা রয়েছে আবার কোথাও বোরো চারা রোপণ করা হয়েছে।