চাঁদপুরে নদীতে অবাধে মাছের পোনা নিধন

চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে নির্বিচারের মাছের পোনা নিধন চলছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রশাসনকে হাত করে দিন-রাত নিষিদ্ধ জাল দিয়ে এ সব পোনা ধরছে অসাধু জেলেরা। আর নিধন করা পোনা শহরের অলিগলিতে বিক্রি হচ্ছে।

মৎস্য গবেষকরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে পোনা নিধন করার কারণে নদ-নদীতে হ্রাস পাচ্ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে নদীগুলো মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা তাদের।

এদিকে প্রশাসন বলছে, নদীতে মাছের উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নদীতে অধিকাংশ মাছই শীত মৌসুমের আগে ডিম ছাড়ে। শীত মৌসুমে ইলিশ, চিংড়ি, পাঙ্গাস, আইড়, রিটা, পাবদা, পোয়া, টেংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনায় ভরপুর থাকে নদীগুলো। কিন্তু কিছু অসাধু জেলে বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে নিধন করছে এসব মাছের পোনা।

জোয়ার-ভাটার সময় বুঝে মধ্যরাতে পাতাজাল, বেহুন্দীজাল, মশারী জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জাল নিয়ে জেলেরা নেমে পড়ছে নদীতে। এ সব জালে শুধু মাছের পোনাই নয়, উঠে আসছে কাঁকড়াসহ উপকারী বিভিন্ন জলজ প্রাণী। নিধন করা পোনা পুরানবাজারসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে নদীর পাড়েই দাদনদারদের কাছে বিক্রি করে দেয় জেলেরা। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শত শত নৌকায় করে হাজারো জেলে পোনা নিধন করে থাকে।

পুরানবাজার রনগোয়াল এলাকার নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে বলেন, শীত মৌসুমে নদীতে প্রচুর পরিমাণে মাছের পোনা পাওয়া যায়। গুড়া মাছ ধরতে নদীতে নামার আগে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নৌ-পুলিশকে হাত করতে হয়। এরপর জোয়ার-ভাটার সময় বুঝে বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন তারা।

সদর উপজেলার আনন্দ বাজার এলাকার হাসান মিয়া বলেন, ‘আগে গাঙ্গে অনেক বড় বড় মাছ পাইতাম। অহন আর আগের মতো পাই না। বড় মাছ পামু কেমনে, গুড়া থাকতেই তো ধইরালায়। হেরা যে পাতাজাল, বেহুন্দী জালসহ বিভিন্ন জাল ব্যবহার করে হের ফাঁস খুবই ছোট। এই জালে কোনো মাছ পলানের সুযোগ নাই। এমনকি মাছের ডিমও উইঠা আহে। জাটকাসহ গাঙ্গ থাকা বেকধরনের মাছের পোনা নষ্ট করছে তারা। এগরে থামানো না গেলে একসময় গাঙ্গ থাকবো, হয়তো গাঙ্গো মাছ থাকবো না।’

জেলা মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সবেবরাত সরকার বলেন, নির্বিচারে পোনা নিধনের ফলে চাঁদপুরে প্রতিনিয়তই কমছে মাছের উৎপাদন। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীগুলো মাছশূন্য হয়ে পড়তে পারে।

ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, পদ্মা-মেঘনা নদী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য ভা-ার। প্রতিবছর শীত মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার টন মাছের রেণু নিধন করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে জাটকা নিধন হয়ে থাকে। যার ফলে মৌসুমে নদীতে নেমে কাক্সিক্ষত মাছের দেখা পাচ্ছে না জেলেরা। এভাবে রেণু নিধন অব্যাহত থাকলে একদিকে মাছের উৎপাদনের ধারা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির শঙ্কা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, মাছের পোনা নিধনকারী জেলেদের বিরুদ্ধে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। প্রশাসনের কেউ যদি এই কাজে জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নদীতে সমন্বিত অভিযান চালানো হবে। যাতে করে কোনোভাবে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে নদীতে মাছের পোনা নিধন করতে না পারে।