সংকটে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বাড়াতে মুদ্রানীতিতে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। আমানতের তুলনায় ঋণের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হওয়া ও সরকারকে ঋণ দিতে গিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থায় তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই তারল্যের জোগান দিতে নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের ৪২৬তম সভা শেষে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন একাধিক বোর্ড সদস্য। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত চলতি বছরের প্রথম বোর্ড সভায় বিষয়টি সরকারের কছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর, বিএফআইইউয়ের প্রধান কর্মকর্তা, চিফ ইকোনমিস্ট ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা।
২০২২ সালের শুরুতে কভিড পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার মধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এতে করে বিশ^ব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন হওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সব পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। এতে করে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে বাজারে টাকার সরবরাহ ঠিক রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নানামুখী চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে রবিবার আসছে নতুন মুদ্রানীতি। বৈশ্বিক মন্দায় দেশের বাজারে টাকার সরবরাহ ঠিক রাখতে যথাযথ সিদ্ধান্ত আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের বৈঠকে মুদ্রানীতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ জানুয়ারি চলতি অর্থবছরের বাকি ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণার কথা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২২) ব্যাংক থেকে সরকারের নিট বা প্রকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। তবে এ সময়ে নতুন করে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিয়েছে ৬৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এ সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ শোধ করেছে ৩৩ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট বা প্রকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। আবার আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় গত এক বছরে রিজার্ভ থেকে ডলারের জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে বিপুল পরিমাণের টাকা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারে জমা পড়েছে। এর বাইরে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে আমানতকারীদের আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। যার কারণে ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে বিপুল পরিমাণের টাকা চলে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারল্য জোগান দিতে আসন্ন মুদ্রানীতিতে বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করেছে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে যা ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল। মূলত সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা বিশ্লেষণ করে মুদ্রানীতিতে প্রাক্কলন কিছুটা কমানো হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি নভেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আগের মাস অক্টোবর শেষে যা ছিল ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আগস্টে ছিল ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং জুলাইয়ে মাসে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
এদিকে গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নগদ ফাইন্যান্স পিএলসিকে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সদ্য অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবসা করতে আইনগত বিশেষ ছাড় চেয়ে যে আবেদন করেছে, তা বিবেচনার জন্য সরকারের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্ষদ। সরকারের অনুমোদন পেলে ডাক বিভাগের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক পরিচালিত মোবাইল ব্যাংকিং ‘নগদ’ নিজেরাই পরিচালনা করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্র জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমএফএস ব্যবসার সুযোগ নেই বলে লিজিং কোম্পানিটি শর্ত শিথিলের জন্য আবেদন করেছে। বিষয়টি বোর্ডে উত্থাপিত হয়েছে। যেহেতু আইনগত ছাড় দেওয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই, তাই সরকারের কাছে বিষয়টি সিদ্ধান্তের জন্য পাঠানো হবে। সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সিদ্ধান্ত জানাবে।
জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের লাইসেন্স ছাড়াই ডাক বিভাগের ব্র্যান্ড ব্যবহার করে ব্যবসা শুরু করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘নগদ’। স্বল্প সময়ে তারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তত্ত্বাবধানের বাইরে থেকে যায় এমএফএস প্রতিষ্ঠানটি। ফলস্বরূপ সন্দেহজনক লেনদেন, বিধিবহির্ভূত ব্যাংক লোন ও মূলধনের অতিরিক্ত ই-মানি তৈরির মতো বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ডাক বিভাগের মালিকানায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে ব্যাংকের সঙ্গে না গিয়ে নিজেরই আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে নগদ কর্তৃপক্ষ। নাম প্রস্তাব করা হয় ‘নগদ ফাইন্যান্স পিএলসি’।