অনেক লজ্জা অনেক লুকোচুরি তবুও...

রাত ৩টা। হঠাৎ হঠাৎ ট্রাক চলাচলের শব্দ কিংবা মোড়ে মোড়ে বেওয়ারিশ কুকুরের ডাক শোনা যায়। শীতের রাত, তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর মধ্যেই রাস্তায় অনেক মানুষের গলার নিচুস্বর কানে আসে। কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া এত রাতে মানুষের জটলা সাধারণত হয় না। আমি থাকি তিনতলায়। কৌতূহলবশত বারান্দা থেকে নিচে উঁকি দিতেই দেখা গেল সারিবদ্ধ কয়েকজন নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন। কেউ কি মারা গেল? তাহলে তো মসজিদের মাইকে ঘোষণা শুনতাম। কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া কিংবা চুরি-ডাকাতির ঘটনা না তো? তাহলে তো চিৎকার-চেঁচামেচি হতো। কিন্তু তেমন কিছুই না।

কিছুটা সময় লাগলেও বোঝা গেল, আমার বাড়ির পাশেই খোলাবাজারে (ওএমএস) পণ্য বিক্রির দোকান খোলার অপেক্ষায় আছেন এসব লোকজন। তাদের পেছনে দূরত্ব রেখে ইটের টুকরো দিয়ে সিরিয়াল দেওয়া। কিন্তু রাত ৩টায় কেন? আমি যতদূর জানি সকাল ৮টার আগে ওএমএসের দোকানটি খোলে না। জানতে পারি সকাল হতে হতে লাইন অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়। অনেক সময় সকালে এসে লাইনে দাঁড়ালে পণ্য পেতে দুপুর গড়িয়ে যায়। তাই লাইনের প্রথম দিকে যাতে থাকা যায় সে জন্য তারা রাতেই এসে অপেক্ষা করছেন। তীব্র শীতও অভাবের তাড়নাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে ওএমএসের লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া গতি কী। কাপড় জোড়াতালি দিয়ে বা সেলাই করে চলা যায়। কিন্তু না খেয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?

সময়টা ছিল ১০ জানুয়ারি শেষ প্রহর। সেদিন আটা দেবে। আটার দাম এখানে প্রতি কেজি ২৫ টাকা, যা দোকানে ৫০ টাকা। একজন পাঁচ কেজি করে আটা নিতে পারবেন। এ কারণে এখান থেকেই বহুদিন ধরে আটা নিচ্ছেন এক নারী। নাম জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, স্বামী রিকশা চালায়। দুই মেয়ে, এক ছেলে। স্বামী সারা দিন রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফেরেন। আবার সকালে বের হতে হয় রিকশা নিয়ে। ছেলে ছোট। আর মেয়েরা ছোট হলেও দিনের বেলায় লাইনে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু রাতে না।

শুধু এ নারীই নন, তার মতো আরও প্রায় ১০-১২ জন মধ্যবয়সী নারী লাইনে দাঁড়ানো। কথা বলার সময় কেউ কেউ শাড়ির আঁচল কিংবা চাদরে মুখ ঢাকছিলেন। কেউ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলেন। এ শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে রাত জেগে কয়েক কেজি আটার জন্য একজন মানুষ তখনই দাঁড়ায় যখন তার খরচের লাগাম টানতে হিমশিম অবস্থা হয়। এ রাতে অনেক কিছুরই ভয় থাকে। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকে। তা সত্ত্বেও তারা লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কারও কাছে হাত পাতার চেয়ে কিছুটা কষ্ট করে বেঁচে থাকার চেষ্টা।

সীমার বয়স ৪০। স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে বাবার সঙ্গে কাজ করে। বয়স ১৮। ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। দুই মেয়ে স্কুলে পড়ে। তিনি বাসাবাড়িতে কাজ করেন। চাদরে মুখ ঢেকে বলেন, ‘সংসারে এত খরচ। কী করমু। এখান থেকে  চাল, আটা নিই। বাজারে ডাবল দাম। একটু কষ্ট হলেও খরচ তো বাঁচে।’ রাতে কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘ছেলের বাবা আর ছেলে সকালে কাজে যায়। মেয়েরা স্কুলে পড়ে, লাইনে দাঁড়াতে দিই না, মানুষ দেখব। আমিও তো সকালে কাজে যাই। এ জন্য রাতে আসছি।’

পেছন থেকে মায়া নামে এক নারী বলছিলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম এত বাড়ছে। আমরা গরিব মানুষ যেখানে কমে পাই, সেখানেই যাই। কী করমু। খাইতে তো হয়। না খাইয়া বাঁচমু কেমনে। দিনের বেলা লাইনে দাঁড়াইতে শরম লাগে।’

যখন কথা হচ্ছিল, তখন কেউ কেউ সামনে থেকে সরে যাচ্ছিলেন, হয়তো কোনো ভয়ে বা লজ্জায়।

এলাকায় আমার বসবাস দীর্ঘদিনের। প্রায় ৪০ বছর। একটু নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করেন এখানে। কয়েকটি বস্তিও আছে। এদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় থাকেন। তারা আমার পরিচিত, আমাকে চেনেন তারা। অনেকের অবস্থা হয়তো কিছুদিন আগেও মোটামুটি ভালোই ছিল। কম খেলেও কারও কাছে হাত পেতে বা ন্যায্যমূল্যের দোকানে লাইনে দাঁড়াতে হতো না। অবাক করা বিষয়, মুখ ঢেকে যারা আমাকে আড়াল করতে চাইছেন ওরা তারাই।

সবুজবাগ থানাধীন দক্ষিণগাঁও ৩ নম্বর রোডে কাছাকাছি স্থানে তিনটি ওএমএসের দোকান। সকালে প্রতিটিতেই শতাধিক মানুষের লাইন দেখতে পাই। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, এখানেও গভীর রাতে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে দোকান খোলার অপেক্ষায় থাকেন। আরও একটি বিষয় খেয়াল করি, ওএমএস কার্যক্রমের শুরুতে মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেকে গোপন রাখতে চাইতেন। কিন্তু গত ১০ জানুয়ারি অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনকে দেখলাম যারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, তারা আর মুখ লুকাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত আগস্ট মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর সেপ্টেম্বর মাসে তা হয় ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ওই সময় মূল্যস্ফীতি বা খাদ্যপণ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল দুই অঙ্কের কাছাকাছি। পেট্রল, অকটেন, ডিজেলসহ জ¦ালানি তেলের দাম গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে সাড়ে ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

যদিও বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, খাদ্যপণ্যে ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। যা নভেম্বর মাসে ছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যা গত নভেম্বর মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

অর্থাৎ একজন মানুষকে দৈনিক যেসব পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে হয় এর প্রতিটির মূল্যই বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ বা তারও বেশি। এ কারণে খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে ওএমএসের লাইন দাঁড়ানো ছাড়া স্বল্প আয়ের ও নিম্ন-মধ্যবিত্তে আর কী বিকল্প থাকতে পারে?

বাসার পাশের ওএমএসের দোকানে দিনের বেলায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন ষাটোর্ধ্ব আবদুল মালেক। এলাকায় থাকেন দীর্ঘদিন। আগে ছোটখাটো চাকরি করতেন। কাছে গিয়ে নিচুস্বরে জানতে চাই, চাচা আপনি কী নিচ্ছেন। সাবলীলভাবেই বললেন, ‘আটা নেব। এখানে আটা ভালো দেয়। আগেও নিয়েছি। দোকানের চেয়ে অর্ধেক দাম। তাই খরচ বাঁচাতে এখানে আসছি। লাইনে দাঁড়াতে হয় এই যা।’ যোগ করলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, কোনো উপায় নেই।’