আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বেশ উচ্চৈঃস্বরেই নিজের নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা আছে। বিদেশিদের চাপও আসতে শুরু করেছে বিভিন্নভাবে। এ চাপ সামলাতে সংবিধান সমুন্নত রাখার কৌশল ধরেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাবে এমনটাই জানা গেছে দলটির নেতাদের কাছ থেকে।
আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংবিধানের মধ্যে থেকেই বিদেশি যেকোনো পরামর্শ সরকার রাখবে। সংবিধানকে ভিত্তি ধরে এগোনোর কৌশল বিফল হবে এমনটা মনে করেন না ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।
আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইস্যু ও নির্বাচন বিষয়ে বিদেশি পরামর্শ আমলে নেওয়ার একমাত্র পথ সংবিধানসম্মত উপায় অবলম্বন করা। তাতে আওয়ামী লীগের দুই কূল রক্ষা পাবে। বিদেশিদের পরামর্শ যেমন রাখা হবে, তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই নির্বাচনকালীন সরকারও থাকবে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো দেশই সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে না। আর সেটা আমরাও মানতে বাধ্য নই।’ দলের সঙ্গে বিদেশিদের সম্পর্কোন্নয়ন নিয়ে কাজ করা এই নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ সরকারের নেই। সংবিধানের মধ্যে থাকা সকল সুযোগ সব দল সমানভাবে ভোগ করবে।’
ফারুক খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই বলে আসছেন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। কাউকে নির্বাচনে আনতে, ক্ষমতায় নিতে অন্যায় আবদার রাখার মতো দল কি আওয়ামী লীগ?
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সরকারের নেই। সুতরাং নিরপেক্ষ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার বিএনপির দাবি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংবিধানে যেভাবে বলা আছে সেভাবেই। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন বিদেশিরা চাপ দিতে পারবে, কিন্তু সংবিধান বা আইন লঙ্ঘনের জন্য চাপ দিতে পারবে না তারা। প্রত্যেক দেশেরই আলাদা আইন-সংবিধান থাকে। সেই নির্দেশিত পথে চলতে হয় সরকারকে। আওয়ামী লীগের অবস্থান এইদিকে থাকলে বিএনপির দাবি মানার চাপ দিতে নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে যাবে বিদেশিরা।
তারা বলেন, সংবিধানে থাকা সকল সুযোগ সব দল ও গোষ্ঠীর নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে বিদেশিদের কাছে অঙ্গীকার করা হবে, কিন্তু সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সরকারের নেই।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানায়, তাদের মূল অবস্থান হলো কোনো অনির্বাচিত প্রতিনিধি বা স্বল্প সময়ের কোনো সরকারের হাতে নির্বাচন পরিচালনা করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগ দেবে না। এর বাইরে অন্য দাবিতে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা-প্রস্তুতি আওয়ামী লীগ রাখবে। নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতা কমিয়ে কীভাবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা যায় তেমন গ্রহণযোগ্য ‘ব্যবস্থাপত্র’ থাকলে সেখানে ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকবে ক্ষমতাসীনরা। নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে সরকার। ভোটের সময় দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অবাধ যাতায়াত ও ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে সরকার সকল সহযোগিতা দেবে। এমনকি নির্বাচনের সময় সকল রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবেএ ব্যাপারে কারও কোনো পরামর্শ থাকলে সেটিও ইতিবাচকভাবে নেবে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন যে, নির্বাচনের আগে অর্থাৎ চলতি বছর মার্চের শেষে এ ধরনের সকল কিছুতেই আপস করা ও ছাড় দেওয়ার মনোভাব দেখানো হবে; কিন্তু সংবিধানের বাইরে যাওয়ার বিদেশিদের দাবি ও চাপ সুকৌশলে এড়িয়ে চলবে দল ও সরকার।
আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধান সমুন্নত রাখার এই কৌশলের কারণে বিদেশি শক্তিগুলো চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারবে নাএ বিশ্বাস তাদের আছে। তারা মনে করেন, সংবিধান সমুন্নত রাখার প্রশ্নে নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি দুর্বল হয়ে যাবে। তাই নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকারকে চাপ দেওয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হবে বিদেশিরা।
আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা বলেন, বিএনপি যেমন লবিস্ট নিয়োগ করে বিদেশিদের কৃপা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তেমনি সরকারও লবিস্ট নিয়োগ করে সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ যে নেই তাদের সেটা বোঝাতে সমর্থ হচ্ছে। পাশাপাশি সংবিধানসম্মত সবকিছুতে আওয়ামী লীগ বা সরকারের দ্বিমত না থাকার কথা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ওই নীতিনির্ধারকদের দাবি, সংবিধান লঙ্ঘন না করার বিষয়ে দলের প্রচার সফল হচ্ছে। কারণ দেশের জনগণ তা মেনে নিতেও শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশিরাও এ ব্যাপারে চাপ সৃষ্টির নৈতিকতা হারাবে।
এ ছাড়া কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর কর্মকর্তাদের উপস্থিতি থাকা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতারাও যাচ্ছেন। সংবিধানের বাইরে কেন যাওয়া যাবে না সে বিষয়ে বিদেশি ওই কর্মকর্তাদের কাছে আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরছেন তারা। একই সঙ্গে বিদেশিদের জানিয়ে দিচ্ছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য বিদেশি হস্তক্ষেপ বা চেষ্টা বেআইনি হবে, নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, জনগণের কাছে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে এবং গ্রহণযোগ্য হবে না।