বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা ও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের চুপ থাকা নিয়ে জাতীয় সংসদে সমালোচনা হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা (এমপি) বলেন, শেয়ারবাজার, অর্থনৈতিক অবস্থা, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স কিছু নিয়েই অর্থমন্ত্রী কথা বলেন না। তাকে জবাব দিতে হবে, বিতর্কে অংশ নিতে হবে। জাতিকে আশাবাদী করতে হবে, বোঝাতে হবে কারা অপপ্রচার চালায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘শেয়ারবাজার, অর্থনৈতিক অবস্থা, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স কিছু নিয়েই অর্থমন্ত্রী কথা বলেন না। তিনি অত্যন্ত সজ্জন, বিনয়ী, অভিজ্ঞ, বিদ্বান ব্যক্তি। তাকে সম্মান না করে পারা যায় না। কিন্তু তিনি নীরব কেন?’ তবে অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন জাপার এই এমপি।
অর্থমন্ত্রী একেবারে নীরব হয়ে গেছেন উল্লেখ করে রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে জবাব দিতে হবে, বিতর্কে অংশ নিতে হবে। জাতিকে আশাবাদী করতে হবে, বোঝাতে হবে কারা অপপ্রচার চালায়। কারা বলে ব্যাংক শূন্য, রিজার্ভ শূন্য, দেশে দুর্ভিক্ষ হবে। এসবের জবাব দেবে কে? অর্থমন্ত্রী। আশা করি তিনি ব্যাখ্যা দেবেন।’
তিনি আরও বলেন, “অনেকে ‘ফ্রি স্টাইলে’ ঋণখেলাপি হচ্ছে। নয়-ছয় করে, ঘুষ-দুর্নীতি করে টাকা আয় করছে। সে টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করেএগুলো দেখবেন অর্থমন্ত্রী। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে। এটা করা অর্থমন্ত্রীর অর্পিত দায়িত্ব।” যারা চুরিচামারি করে, নয়-ছয় করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে তাদের ছবি পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান জাপার এই এমপি।
অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই ভালো আছে। এজন্য অনেক ভালো কাজ করতে হয়েছে। সেগুলো করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছেন। কিন্তু অনেকে নিজের কাজ না করে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। এটাই সমস্যা। পদ্মা সেতু নির্মাণ করায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সারা জীবন দোয়া করতে হবে।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য লুৎফুন্নেসা খান বলেন, ‘বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা কঠিন ছিল। তবে সেটা ধরে রাখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছেন। মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি।’ তিনি বঙ্গবন্ধুর আমলের মতো সাধারণ মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানান।
লুৎফুন্নেসা খান আরও বলেন, ‘এ বছর শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ে সবাইকে বই দেওয়া সম্ভব হয়নি। বইয়ে অসংখ্য বানান ভুল, কাগজ নিম্নমানের, বইয়ে সাম্প্রদায়িক বিষয় আছে। এগুলো এই সুন্দর উদ্যোগকে ম্লান করেছে।’
অন্যদের মধ্যে সরকারি দলের সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল, আমিরুল আলম মিলন, সাহিদুজ্জামান, বদরুদ্দোজা ফরহাদ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরমা দত্ত, সৈয়দা জোহরা আলাউদ্দীন প্রমুখ বক্তব্য দেন।
রিজার্ভ শিগগির শক্ত অবস্থানে ফিরবে : আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম কমতে থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘সরকার অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে। এ পদক্ষেপ নেওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও খুব দ্রুত আগের মতো শক্ত অবস্থানে ফিরবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদনে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আয়, রেমিট্যান্স, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, এডিপির ব্যয়, ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহসহ মৌলিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চালকসমূহের অবস্থান সন্তোষজনক। আমদানি ও রপ্তানি আয়ে উভয়ক্ষেত্রে ধনাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। চলতি অর্থবছর সরকারের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হবে বলে আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, ‘কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হয়ে আসা এবং মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় গত অর্থবছরের একই সময়ে অনেক বেড়েছিল। বর্তমানে বিলাসপণ্যের আমদানি পরিহার করা ও সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে আমদানি খরচ কমেছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ঋণপত্র ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম খোলা হয়েছে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। সেই তুলনায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর সময়ে বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর ২০২১-এর ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশের তুলনায় সেপ্টেম্বর ২০২২-এ ৯ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে।’
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘কভিড পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেও চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য এবং গম, ভোজ্য তেলসহ প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে উন্নত দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানান বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়।’
চলতি অর্থবছর রাজস্ব আহরণ আশানুরূপ হারে বাড়বে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের মাত্রা কমিয়ে আনাসহ আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করা ও কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগের গতিধারা সমুন্নত রাখতে সরকার সচেষ্ট।’
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার জুলাই প্রান্তিকে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সরকারি ব্যয়ও বেড়েছে। রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। চলমান মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ। আমাদের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তি, বিভিন্ন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অভিঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নেওয়া বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ফলে অর্থনীতির প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এসব বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে বলে আশা করছি।’