দেশে সবচেয়ে বড় গাড়ি আমদানিকারক ও সরবরাহকারী নিটল নিলয় গ্রুপ, যার চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমাদ। গাড়ি দিয়ে ব্যবসা শুরু হলেও বর্তমানে গ্রুপটির অধীনে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন, সিমেন্ট, প্লাস্টিক, চিনিকল, বীমা, কাগজ, সিকিউরিটি কোম্পানিসহ নানা ব্যবসা রয়েছে। নিজের ব্যবসা ও দেশে বিনিয়োগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিটল নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমাদ কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ফারজানা লাবনীর সঙ্গে
পারিবারিক গন্ডি থেকে বেরিয়ে কঠোর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান। দেশের ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের অধিকার আদায়ে কথা বলেন। ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) সভাপতি মাতলুব আহমাদ দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
নিজের ব্যবসা সম্পর্কে মাতলুব আহমাদ বলেন, অধ্যবসায় আর নিয়মানুবর্তিতায় গড়ে তুলেছি নিটল নিলয় গ্রুপ। পারিবারিক ব্যবসা থেকে বেরিয়ে ১৯৮২ সালে এককভাবে গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে টাটার সঙ্গে কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে দেশের ট্রাকের বাজারের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ, বাসের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং মিনি ট্রাকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নিটল নিলয়ের আওতায়। বাংলাদেশে বাজারে ভারতের হিরো মোটরসাইকেল সরবরাহকারী তার প্রতিষ্ঠান। মিনি ট্রাক বানানোর পরিকল্পনা আছে নিটল নিলয় গ্রুপের। যাতে কম দামে মানুষের হাতে এ যানবাহন পৌঁছানো যায় সে চেষ্টা করছেন তিনি। টাটার সঙ্গে বাংলাদেশেই এসব গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। অচিরেই তা বাস্তবায়নে যাবেন বলে তিনি জানান।
দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে অভিজ্ঞ এ ব্যবসায়ী বলেন, করোনা মহামারীতে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। করোনার আঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতে শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও সংকটে পড়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছে। পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলায় এরই মধ্যে সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরিবহন খরচ বেড়েছে অনেক বেশি। প্রায় সব আমদানি করা পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডলার সংকটে প্রায় সব দেশের মতো বাংলাদেশও বিপাকে পড়েছে। আমদানি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে রিজার্ভ কমেছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ ব্যবসায়ে গতিও কমেছে। শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশে বেকারত্ব বেড়ে যেতে পারে। পণ্য সংকটে শেষ পর্যন্ত জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাতলুব আহমাদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিবেচনায় রেখেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কৌশল নির্ধারণে সরকারকে বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। এত সংকটের মধ্যেও রপ্তানি আয় বেড়েছে এটা আশার কথা। তবে আশঙ্কার কথা তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা এখনো কমানো সম্ভব হয়নি। পাট, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ ভাঙা, আইসিটি, সাইকেল, পরিবহন, পর্যটনসহ আরও কিছু সম্ভাবনাময় খাতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। অন্যদিকে রপ্তানির পুরনো বাজার সম্প্রসারণে এবং নতুন বাজার সৃষ্টিতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে চেষ্টা করতে হবে জানান নিটল নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান।
ডলার সংকটে দেশের বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা বিশ্ব অর্থনীতির সমস্যা। এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। ডলার সংকটের কারণে আমরা এলসি খুলতে পারছি না। তাই পণ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। যা আমদানি করছি তার দাম স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। আগে আমদানি করা পণ্য এখনো আমাদের কাছে আছে। তাই বাজারে ছাড়ছি। কিন্তু কতক্ষণ? মজুদ পণ্য শেষের দিকে। অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। দেশের বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে না পারলে সামনে শবেবরাত-রমজান-ঈদে পণ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তাই জরুরিভাবে এলসি খুলে পণ্য আনার বিষয়ে সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু উৎসবকেন্দ্রিক পণ্যই নয়, ব্যবসায়ে ব্যবহৃত কাঁচামালের সংকট দেখা দিতে পারে। এসব পণ্য আমদানিতেও সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।
দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয় বলে মনে করেন আবদুল মাতলুব আহমাদ। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতকেও ভূমিকা রাখতে হবে। দেশে জ্বালানি সংকট এখনো বড় ধরনের সমস্যা। দেশব্যাপী অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে আমলাতন্ত্রের জটিলতা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আমাদের সরকার খুব ভালো ব্যবস্থাপক হলেও তাদের কাজের ধারাটাই ধীরগতির। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আরও দ্রুত বাস্তবায়ন। সরকারের ওপর শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার দায়িত্ব না দিয়ে বরং তা মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। এটা বর্তমান সরকার উপলব্ধি করছে। তারা বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে।
সরকার, বিদেশি এবং স্থানীয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা একসঙ্গে কাজ করলে শিল্প খাতে বিরাজমান সমস্যার অনেক কিছুই দূর হবে। আগামী দিনগুলোয় এ দেশে পিপিপি মডেল কার্যকরী করতে হবে। বিশেষভাবে পিপিপি মডেলের আওতায় অতিদ্রুত অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের উদ্যোগ আরও জোরালোভাবে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন মাতলুব আহমাদ। তিনি বলেন, আমাদের ১৬ কোটি মানুষের বাজার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এ বাজারের জন্য অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী আমাদের দেশে এসে ব্যবসা করতে আগ্রহী।
বর্তমানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, সমস্যা থাকবে তবে তার মধ্যেও বিনিয়োগ করতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ কারখানার মোট উৎপাদন খরচের ১৫ শতাংশের বেশি নয়। সরকারের ভর্তুকিযুক্ত বিদ্যুৎ পাওয়ায় বসে না থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিককে বিদ্যুৎ তৈরি করে নেওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে মোট খরচ বেড়ে যাবে যা মোট উৎপাদন খরচের ২০ শতাংশ হবে। বিদেশি যেসব বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আসছে, তারা কেউ বাংলাদেশের গ্যাস-বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে আসছে না। কোনো কোনো পণ্য ভারত থেকে রপ্তানি করলে সাড়ে ২২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। আবার বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করলে তার প্রয়োজন হয় না। এ দেশে ব্যবসা করে সাড়ে ২২ শতাংশ লাভ করে যদি ১০ বা ১৫ শতাংশ জ্বালানি খাতে ব্যয় করে, তবে কোনো ক্ষতি নেই বলে মনে করেন নিটল নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, অতীতের ট্যারিফ নন-ট্যারিফ বাধা অনেক কমেছে। এতে বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা একদিনে হয়নি। যেকোনো দেশে পলিটিকস, বিজনেস এবং ব্যুরোক্রেসি থাকবে। বাংলাদেশ-ভারতের উদ্যোক্তারা যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা করবেন এমন ধারণাকে উভয় দেশের রাজনীতিবিদরা স্বাগত জানালেও ট্যারিফ নন-ট্যারিফ বাধা সরিয়ে নিতে অনেক সময় লাগছে। কারণ ব্যুরোক্রেসি। আবার কোনো কোনো ব্যবসায়ী ধারণা করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এলে স্থানীয় বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে। আসলে সবসময় যে সবকিছুর জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী, তা কিন্তু নয়।
কলেজপড়ুয়া মাতলুব আহমাদের বাবা মারা যান। ১৪ ভাইবোনের সংসার ছিল তাদের। সবচেয়ে বড় ভাইয়ের বয়স তখন ২৭ বছর। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে রুজি-রোজগারে নামেন। বড় ভাইয়ের সঙ্গে এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা শুরু করেন মাতলুব আহমাদ। একই সঙ্গে লেখাপড়াও চালিয়ে যান। কঠোর পরিশ্রম করেন। একসময় ভাইবোনরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠলেন। তত দিনে বিয়ে করেছেন। নিজে আলাদা ব্যবসা শুরু করেন। যাত্রা শুরু হয় বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের প্রথম গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নিটল মোটরস লিমিটেডের। লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ করেন মাতলুব। স্ত্রী সেলিমা আহমাদ তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন, যিনি নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নিটল নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।