বর্ষায় চট্টগ্রামের পটিয়ায় পাহাড়ি ঢলে উপচে পড়ে পানি। কিছু ক্ষেত্রে তা বিপর্যয়ের কারণও হয়। তবে এসব পাহাড়ি ঢলকে সাগরে যেতে না দিয়ে ড্যাম স্থাপনের মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পটিয়া এলাকায় সেচের মাধ্যমে চাষাবাদও সহজ হবে বলে মনে করছে উদ্যোগী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পটি আগামী ১৭ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ায় শ্রীমাই খালে ‘মাল্টিপারপাস হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম’ শীর্ষক প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হচ্ছে, পটিয়া উপজেলার শ্রীমাই খালে ৮৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ করে পাহাড়ি ঢালসহ বর্ষা মৌসুমের বিপুল পরিমাণ জলরাশি সংরক্ষণের মাধ্যমে ১ হাজার ১০৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। শ্রীমাই খালের উভয় তীরে ৪ কিলোমিটারের তীর প্রতিরক্ষা কাজ করার মাধ্যমে ভাঙন প্রতিরোধ করা হবে।
এজন্য প্রকল্প এলাকায় হাইড্রোলিক ড্যাম-কেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগও তৈরি হবে। মৎস্য সম্পদের উন্নয়নসহ প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং এলাকার কর্মসংস্থান বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি সাধন করা; এবং ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চতা বাড়ানোও এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
প্রকল্পটির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৪০০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ, ৩০০ মিটার খাল খনন, ২১০ মিটার সেচ কাঠামো (সেচ খাল) নির্মাণ, ৫১০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ১টি হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ, ১টি রেস্ট হাউজ নির্মাণ।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে পানিস্বল্পতার জন্য প্রকল্প এলাকায় সেচ কাজসহ অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ অঞ্চলে ড্যাম এবং রিজার্ভার নির্মাণের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢলসহ বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে।
পানি সংরক্ষণ ও নদীপথের ল্যান্ডস্কেপিং, সেচের পানি সংরক্ষণ, নদীর ধারণ ক্ষমতা বর্ধন ইত্যাদি নানাবিধ প্রকল্পে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম একটি নতুন প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি অনেকটা রাবার ড্যামের মতো তবে আধুনিক নির্মাণশৈলী ব্যবহৃত হওয়ায় এর সুবিধা রাবার ড্যামের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। চীনা প্রতিষ্ঠান বেইজিং আইডব্লিউএইচ করপোরেশন হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছে। চীনে এ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের লক্ষ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি ২০১৩ সালে চীনে অবস্থিত কয়েকটি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম পরিদর্শন করে। কমিটি পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় পাইলট ভিত্তিতে অন্তত দুটি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সুপারিশ করে একটি কারিগরি প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরবর্তী সময়ে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সম্ভাব্য অবস্থানগুলো পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে বিআইসির একটি বিশেষজ্ঞ দলকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২০১৫ সালে চীনা দলটি বাংলাদেশে ড্যাম নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে উপযুক্ত স্থান শনাক্তকরণের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ায় শ্রীমাই খাল, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার মন্দাকিনী নদী এবং খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার মাইনী নদীসহ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে। চীনা দলটি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার শ্রীমাই খাল এবং খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলার মাইনী নদীতে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
এর ভিত্তিতে পাউবোর মাধ্যমে ২০১৯ সালের জুন মাসে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন করে। চীনা দলের প্রতিবেদন ও আইডব্লিউএমের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার আলোকে পটিয়ার শ্রীমাই খাল, দিঘীনালার মাইনি নদী ও রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালির শিচক ছড়াতে ১টি করে মোট ৩টি ড্যাম নির্মাণের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির ডিপিপির ওপর ২০২১ সালের অক্টোবরে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইএমইডি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার কর্মকর্তাসহ গঠিত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে। এ সময় সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার শ্রীমাই খালের ওপর প্রস্তাবিত হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণের সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে।