কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিষয়ে আরও দক্ষতা বাড়িয়ে চাকরির বাজারে চাহিদাসম্পন্ন স্নাতক তৈরিতে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ১ হাজার ৯৪ কোটির এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি)। সম্প্রতি প্রকল্পটি নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পটি প্রশংসনীয় হলেও এর বিভিন্ন খাতের ব্যয় ও অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এর ফলে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী সিএসই ও আইটিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করবেন। এর আওতায় ২৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী থাকবেন। ডিগ্রি অর্জনের পর কমপক্ষে ৪০ শতাংশ সরাসরি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবেন। পাশাপাশি এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দুই বিষয়ে অনুষদ সংখ্যা ২০০তে উন্নীত হবে। এই প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫৫টি উদ্যোক্তা গ্রুপ তৈরি করা হবে। ন্যূনতম ৮টি কোম্পানিকে বিধিসম্মতভাবে নিবন্ধিত করা হবে।
প্রকল্পে ২৫ ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় পরামর্শক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। যেমন জাতীয় পরামর্শক খাতে সিনিয়র প্রকিউরমেন্ট স্পেশ্যালিস্ট, ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশ্যালিস্ট, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক পরামর্শক। আন্তর্জাতিক ভিজিটিং প্রফেসরস কনসালট্যান্ট নিয়োগ বাবদ এডিবির অর্থ থেকে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে বৈদেশিক অর্থায়নে পরামর্শক সেবা গ্রহণ না করার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা পরামর্শক সেবা গ্রহণের ব্যয় প্রস্তাবের পুনঃপর্যালোচনা করার কথা বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এ ছাড়া বিশেষায়িত পেশাদার কাজের জন্য সাধারণভাবে পরামর্শ সেবা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, এগুলো সাধারণ প্রকৃতির দাপ্তরিক কাজ। এসব কাজের জন্য কোনো পরামর্শক সেবার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে প্রতিটি ম্যানেজমেন্ট ইউনিটে প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ পদ থাকার পরও সাধারণ প্রকৃতির দাপ্তরিক ক্রয়ে কেন কেন্দ্রীয় প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, তা সুস্পষ্ট নয় বলে মত দিয়েছে কমিশন।
প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ডিপিপিতে একটি জিপ গাড়ি ও চারটি মাইক্রোবাস কেনায় ২ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। চারটি মাইক্রোবাসের প্রয়োজনীয়তা কী, তা স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৩৪টি কম্পিউটারসামগ্রী সংগ্রহে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা, ৪ হাজার ৪০৫টি অফিস সরঞ্জাম সংগ্রহ সঙ্গে ৪৪ কোটি টাকার আসবাব, ৭টি লটে আসবাব সংগ্রহ খাতে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কমিশন বলছে, অর্থ বিভাগের বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কৃচ্ছ্রসাধন, ব্যয় হ্রাসকরণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণিধানযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, তা প্রস্তাবনায় প্রতিফলন করা হয়েছে কি না? এ বিষয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সভাকে অবহিত করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্রয় পরিকল্পনায় কম্পিউটারসামগ্রী, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাব সংগ্রহে একাধিক ছোট ছোট প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সংশোধন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন বৃত্তি প্রদান কর্মসূচিসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বৃত্তি প্রদান কর্মসূচি থাকার পরও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত তিনটি বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ৩৭০ জন নারী শিক্ষার্থী ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৫৪০ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পিইসি।
প্রকল্পে ৫ হাজার ১৯৭ জন শিক্ষার্থীকে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ বা স্টাইপেন্ড বা অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রাম দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প সমাপ্তির পর কীভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্প থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কী কী স্টাডিজ অ্যান্ড সাব-কনট্রাক্টসহ গবেষণা করা হবে, তার সুস্পষ্ট তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সেমিনার, ওয়ার্কশপ, অ্যাডভোকেসি এবং দেশে ২ হাজার ৯১১ জনকে ও বিদেশে ৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। পিইসি সভায় বলা হয়, বর্তমান বৈশি^ক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সরকার কৃচ্ছ্রসাধনে প্রশিক্ষণ খাতের ব্যয় হ্রাসকরণসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশনা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প থেকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক ভিজিটিং প্রফেসর নিয়োগের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা আলোচনা করতে বলা হয় পিইসি সভায়।
প্রকল্পভুক্ত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে বিকাশের লক্ষ্যে কীভাবে এবং কোথা থেকে স্টার্টআপ সহযোগিতা দেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্প থেকে কীভাবে শিক্ষার্থী সেবা ও পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং চালু করা হবে এ-সম্পর্কিত কিছুই স্পষ্ট না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কমিশন।
ডিপিপিতে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের সুপারিশমালায় প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন ও প্রকল্প সমাপ্তের পর সংশ্লিষ্ট আইটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন ও প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষায় পলিসি ও নীতিমালা তৈরির প্রস্তাব করা হলেও প্রস্তাবিত প্রকল্পের কার্যক্রমে এ ধরনের কোনো কার্যক্রম রাখা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।