ঋণ চূড়ান্ত করতে ঢাকায় আইএমএফের ডিএমডি

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ চেয়েছিল বাংলাদেশ। ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাবের চূড়ান্ত আলোচনা করতে সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অ্যান্থনি মনসিও সায়ের গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকায় এসেছেন। পাঁচ দিনের ঢাকা সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দেওয়ার পাশাপাশি পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল পরিদর্শনের কথা রয়েছে তার।

সফরসূচি অনুযায়ী, অ্যান্থনি এম সায়ের আজ (রবিবার) সকাল ১০টা থেকে ১১টায় বাংলাদেশ বাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। একইদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে দ্বিতীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে তার। ওই সভায় অর্থসচিব ফাতিমা ইয়াছমিন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এসএম সলীমুল্লাহ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শরিফা খান ও সংশ্লিষ্টরা থাকার কথা রয়েছে। আর সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে অ্যান্থনি সায়ের বিকেলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়াও ১৭ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। আর ১৮ জানুয়ারি পদ্মা সেতু ভ্রমণ করবেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশ গত জুলাইয়ে ঋণ চাইলে সাড়ে তিন বছর ধরে সাত কিস্তিতে ৪৫০ কোটি ডলার অর্থ দেবে বলে আগেই জানিয়েছে আইএমএফ। আগামী মাসেই প্রথম কিস্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, আইএমএফের কাছ থেকে আগামী তিন বছরে শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশ ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব ঋণের অর্থ এখন দ্রুত ছাড়ের বিষয়ে জোর দিচ্ছে সরকার। আইএমএফের ডিএমডির সফরে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে। প্রথম কিস্তি বাবদ ৪৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার মিলবে।

এরপর প্রতি ছয় মাস পরপর একটি করে কিস্তি দেওয়া হবে। সাত কিস্তিতে দেওয়া এ ঋণের শেষ কিস্তি পাওয়া যাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। ঋণের গড় সুদ হার ২ দশমিক ২ শতাংশ। এদিকে ঋণের কিস্তি খুব কম হলেও আইএমএফের ঋণ পেলে অন্য সংস্থাগুলোর ঋণ পাওয়াও সহজ হবে। এ কারণে সরকার আইএমএফের ঋণ দেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের ঋণ পাওয়ার আগে তার বোর্ডে অনুমোদন নিতে হয়। তারপর অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চুক্তি সই করতে হয়। এসব করতে সময় লাগে। এ জন্য চাইলেও পাইপলাইনে থাকা ঋণ দ্রুত পাওয়ার কথা নয়। আবার কিছু নীতিগত শর্ত পূরণ করতে হয়।

আইএমএফের ওয়েবসাইটে গতকাল মনসিও সায়েরের আনুষ্ঠানিক ঢাকা সফর সম্পর্কে তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি সহনশীল রাখতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করে আইএমএফ। এ জন্য ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে ঢাকা সফর করছেন তিনি।

আইএমএফ বলেছে, বিশ্ববাজার উত্তপ্ত। ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে ডলার, যা আঘাত করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। আইএমএফের দিক থেকে সহায়তা দেওয়ার পদক্ষেপ এ কারণেই নেওয়া হয়েছে। তারা আরও বলেছে, বৈশ্বিক মহামারী ও মহামারী-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এর আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিই ছিল। বাণিজ্য ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান জ¦ালানি খরচ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হওয়ার কারণে সংকটের সীমানায় রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এসব কারণে ব্যয়ের দিক থেকে ভোক্তাদের পরিবর্তন এসেছে অর্থাৎ কম খরচ করতে পারছেন ভোক্তারা। অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ক্ষুন্ন হচ্ছে।

আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ যে ঋণ পাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। আইএমএফ মনে করছে, রাষ্ট্রীয় তহবিল বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্ধিত মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ঋণটি ঢাকার জন্য বহুলাংশে একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও।