৯-১৪ বছরের কিশোরীদের ২ ডোজ টিকা দেওয়ার পরামর্শ

প্রতি বছর বাংলাদেশে আট হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। মারা যায় অন্তত পাঁচ হাজার। নারীদের বিভিন্ন ক্যানসারের মধ্যে স্তন ক্যানসারের পরেই এর স্থান। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিবন্ধন প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীদের দ্বিতীয় প্রধান ক্যানসার এটি। অথচ জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসায় সুস্থ হওয়া সম্ভব। এ ছাড়া জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে ৯ থকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের দুই ডোজ টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে জরায়ুমুখের ক্যানসার সচেতনতা দিবস ও সচেতনতা মাস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়।

বক্তারা বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধের জন্য এইচপিভি নামের ক্ষতিকর ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকাদান, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং এ ক্যানসারের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা দরকার, যার কোনো কার্যকর জাতীয় কর্মসূচি এখনো নেওয়া হয়নি। এইচপিভি ভাইরাসের মাধ্যামে ৯৫ শতাংশ জরায়ুমুখে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যানসার ইপিডেমিওলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এইচপিভি টিকা পাওয়া যায়। একটি কোম্পপানি উৎপাদন করছে। দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা। আরও কয়েকটি কোম্পানির টিকা উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলছে। টিকার দাম বেশি হওয়ায় অনেকের সাধ্যের বাইরে। তাই টিকার দাম কমানোসহ সরকারিভাবে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যাদের টিকা নেওয়ার সামর্থ্য আছে তাদের টিকা নেওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘এ টিকা মেয়েদের ১০ বছর বয়সের মধ্যে সঠিকভাবে দিতে পারলে ভালো। পরে দিলে ঝুঁকি থাকে। দেশে সরকারিভাবে ২০১৬-১৭ সালে গাজীপুরে ৩৩ হজার ১০ বছরের কিশোরীকে এ টিকা দেওয়া হয়েছে। পরে সারা দেশে এ টিকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে এটা সম্ভব হয়নি।’

ডা. রাসকিন বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো ক্যানসার স্ক্রিনিং জাতীয় কর্মসূচি নেই। আমি পদে থাকা অবস্থায় যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে পারিনি। তাই প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ের জন্য ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ে নারীদের উদ্বুদ্ধ করা এবং স্ক্রিনিংয়ের সংগঠিত ও সমাজভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও তিন ধরনের ক্যানসার স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম করা সম্ভব। ব্রেস্ট, সারভাইবাল ও ওরাল ক্যানসার। আমাদের দেশে ওরাল ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের নাম-গন্ধও নেই। আমি জোর দিয়ে বলছি, জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে যে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চলছে তা অসংগঠিত, অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। আগামী ১০০ বছরেও ২০ শতাংশ মানুষকে আওতায় আনা সম্ভব হবে না।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ও সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমাদের কর্মক্ষেত্র ও আন্তরিকতায় অনেক সমস্যা আছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক ভালো। প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থাও আছে। আমাদের স্বাস্থ্য নীতিমালা এখনো অসম্পূর্ণ। আমরা কারও বুদ্ধি নিতে চাই না। আমরা যা বুঝি তাই। এভাবে চললে আসলে কোনো কার্যকরী নীতিমালা তৈরি সম্ভব নয়।’

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যানসার ইপিডেমিওলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. টিএ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) গাইনি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. লতিফা শামসুদ্দিন, গাইনি অনকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাবেরা খাতুন ও জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. হালিদা হানুম আক্তার প্রমুখ।