বিশ্ব জুড়েই বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিরাজ করছে। এ সংকট কাটাতে বেশিরভাগ দেশই ঋণের সুদের হার বাড়ানোকেই মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু গতকাল রবিবার ঘোষণা করা বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিতে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ দেশের চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়েও ঋণের সুদে ৯ শতাংশের ক্যাপ বহাল থাকছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য সংকট মোকাবিলায় তেমন কোনো চমক নেই এ মুদ্রানীতিতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে তা দিয়ে কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি ঠেকানো সম্ভব নয়। উল্টো সরকারকে যে হারে ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তার জন্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।
দেশে বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ১০৫ টাকা গুনতে হচ্ছে। টাকার এ অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকারকে বিভিন্ন সময়ে গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কারণই হলো অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি দূর করতে হলে অর্থের পরিমাণ কমানোর বিকল্প নেই। এ অর্থের পরিমাণ কমাতে ব্যাংক সৃষ্ট ঋণের পরিমাণও কমাতে হয়। এ জন্য প্রত্যেক দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান উপায় হলো ব্যাংক হার বৃদ্ধি বা রেপো রেট বৃদ্ধি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক রোপো রেট বাড়ালে সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও তাদের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ ব্যয়সাধ্য হয়ে পড়ে এবং ঋণের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। এতে নিয়ন্ত্রণ করা হয় মুদ্রাস্ফীতি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিতে রেপো রেট বাড়ানো হলেও ঋণের সুদে ৯ শতাংশের ক্যাপ বসানো আছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণের বিপরীতে সুদের হার বাড়াতে পারবে না। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পলিসি ব্যর্থ হবে বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঋণের সুদের হারে ক্যাপ বসিয়ে রেপো রেট বাড়ানো হয়েছে। এ রেট কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না।
নতুন মুদ্রানীতিতে নিট ডমিস্টিক অ্যাসেট আগের চেয়ে ১ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১৬ শতাংশ। আর নতুন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে না এ মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের ভূমিকা রাখবে। কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ফাউন্ডেশনই হচ্ছে ঋণের সুদের হার বাড়ানো। সেটাকে অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রানীতি কার্যকর হয় না। যেই মুদ্রানীতি দেওয়া হয়েছে এতে বোঝা যাচ্ছে যে মনিটরি এক্সটেনশন হবে নিট ডমিস্টিক অ্যাসেটের মাধ্যমে। অর্থাৎ টাকা ছাপিয়ে। এটা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া মানি ক্রিয়েশনের কারণে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হবে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে তার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এখন এটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ তার মুদ্রানীতিতে যেসব পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে সেখানে একটাই আছে যা মূল্যস্ফীতির জন্য কিছুটা সহায়ক হতে পারে। সেটি হলো ভোক্তা ঋণে ৩ শতাংশ সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। তবে এ ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের কত শতাংশ তাও দেখার বিষয়। এ ছাড়া তারা বলেছে, টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। সেটা কীভাবে? পুনঃঅর্থায়ন তহবিল অর্থাৎ কৃষি, এসএমই এবং সবুজ অর্থায়নকে লক্ষ্য করে যে তহবিল দেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে। ডিজেল ও বিদ্যুৎ আর কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানি সমস্যার জন্য যদি পোলট্রি ফার্মে বিদ্যুৎ না থাকে, কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা না করা যায় তাহলে এসব তহবিল দিয়ে কী হবে?
যা আছে মুদ্রানীতিতে : নতুন মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার পুরোপুরি তুলে নেওয়া হলো। এ ছাড়া নতুন মুদ্রানীতিতে ভোক্তাঋণের সুদহার বাড়ানোরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ভোক্তাঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। এখন ভোক্তাঋণের সুদহার বাড়িয়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত করতে পারবে ব্যাংকগুলো। তবে শিল্পঋণসহ অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অন্যান্য ঋণের বেঁধে দেওয়া সুদহার তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনাধীন থাকবে।
নতুন মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আমানতের সুদহার উন্মুক্ত করে দেওয়া ও ঋণ সুদহারে কিছুটা শিথিল করায় তা আমানতের সুদহার বাড়াতে সহায়তা করবে।
এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, তিন মাস ও তার বেশি মেয়াদি আমানতের সুদ কোনোভাবেই তিন মাসের গড় মূল্যস্ফীতির কম হতে পারবে না। ২০২০ সালের এপ্রিলে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়ার পর আমানতের সুদহার আড়াই শতাংশেও নামিয়ে এনেছিল।
বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি যেখানে উঠেছে, তাতে ব্যাংকগুলোকে আমানতের সুদহারও বাড়াতে হয়। কিন্তু ঋণের সুদ নির্দিষ্ট থাকায় ঋণ ও আমানতের সুদের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এ জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ ও আমানতের সুদহার তুলে নেওয়ার দাবি করে আসছিল।
নতুন মুদ্রানীতিতে ঋণে সুদহারের ৯ শতাংশ সীমা অপরিবর্তিত রেখে নীতি সুদহার বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংকগুলোকে পুনঃক্রয় চুক্তি বা রেপোর বিপরীতে ৬ শতাংশ সুদে ধার নিতে হবে, যা এতদিন ছিল ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একইভাবে বিপরীত পুনঃক্রয় চুক্তি বা রিভার্স রেপোর সুদহার ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ধারের সুদহার বাড়বে। সামগ্রিক বিবেচনায় এবারের মুদ্রানীতিকে সতর্কমূলক বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের মতোই ১৪ দশমিক ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আর মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ১২ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে বাজেটের বিশাল ঘাটতির অর্থায়নে সরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমায়নি বরং বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে এ লক্ষ্য ঠিক করেছে ৩৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।
মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাবাজার ও সুদহারের নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে মুদ্রানীতি করা হয়েছে। আগামীতে খেলাপি ঋণ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করতে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে এর একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
গভর্নর আরও বলেন, নতুন অর্থবছরের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু উপকরণ ব্যবহার ছাড়া তেমন কোনো করণীয় নেই। যে কয়েকটি উপকরণ রয়েছে, তার মধ্যে প্রধান হলোÑ টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। সেটি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।