নরসিংদীর মাধবদীতে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ চলছে। এরই মধ্যে নদীর উচ্ছেদকৃত জমিতে মার্কেট নির্মাণ করছে ‘সোনার বাংলা সমবায় সমিতি।’ যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সমিতিটির সভাপতি মাধবদী পৌর মেয়র মোশাররফ হোসেন প্রধান মানিক।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল নরসিংদীতে নদীর প্রবাহ তৈরি করতে ৬টি নদ-নদীর ২৩২ কিলোমিটার খননকাজ শুরু হয়। প্রায় ৫২৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মনিটরিংয়ে সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নদনদীগুলো হলো আড়িয়াল খাঁ, হাড়িধোয়া, ব্রহ্মপুত্র, পাহাড়িয়া, মেঘনা ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। এ প্রকল্পের মাধবদী ও বাবুরহাট (শেখেরচর) এলাকায় চার কিলোমিটারে ২৫৭টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে প্রশাসন, যার বেশিরভাগ উচ্ছেদ করা হয়েছে। মাধবদী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন অংশে ভেকু দিয়ে খননকাজ করছে সেনাবাহিনী। নদের দুই তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের চিহ্ন বিরাজমান। সারি সারি ভাঙা ভবন, সেগুলো মেরামতে কাজ করছেন শ্রমিকরা। নদীর পাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে তৈরি হয়েছে পায়ে চলার সড়ক।
তবে ভিন্ন চিত্র নদের বাজার অংশে। বাজারের সোনার বাংলা সমবায় সমিতির অংশে নদীর উচ্ছেদকৃত জায়গায় রাতারাতি গড়ে তোলা হচ্ছে মার্কেট। মাটি দিয়ে নদী ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে মার্কেটের সামনের সড়ক। দিন-রাত শ্রমিকরা মার্কেট নির্মাণে কাজ করছেন। আর তা তদারক করছে সোনার বাংলার সমবায় সমিতির লোকজন। ইতিমধ্যে মার্কেটের ১৯টি দোকান তৈরি করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিটি দোকান বরাদ্দে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা জামানত হিসেবে নিচ্ছে সমিতির লোকজন। সেই হিসাবে মার্কেট থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা আদায় হবে।
মার্কেটের নির্মাণ শ্রমিক ওয়াসিম জানান, দেড় থেকে দুই মাস যাবৎ তারা এই মার্কেট নির্মাণে কাজ করছেন। প্রতিদিন আটজন শ্রমিক রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। এ ছাড়া টিনের চাল তৈরি ও রং দিতে আলাদা আরও লোক কাজ করছে।
সংবাদকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহের খবর শুনে সোনার বাংলা সমিতির কয়েকজন এসে কীসের সংবাদ সংগ্রহ করা হচ্ছে জানতে চান। ওই সময় নদের জমিতে মার্কেট নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা মেয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
উচ্ছেদের মধ্যেই মেয়রের মার্কেট নির্মাণ নিয়ে মাধবদীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সমালোচনার ঝড় বইছে। জানতে চাইলে ছোট গদাইরচর এলাকার হাজি সোহরাব বলেন, আমার টি রেকর্ডের সম্পত্তি যার মূল্য আনুমানিক তিন কোটি টাকা নদী খননের সময় উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর অন্যদিকে প্রভাবশালীরা নদীর পাড় দখল করে মার্কেট নির্মাণ করছে, এগুলো আমাদের কলিজায় লাগে।
একই এলাকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নদ খননের সময় আমার ৩টি রুম ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন আমরা দিশেহারা। চলাফেরা করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। একদিকে আমরা কষ্ট করছি অন্যদিকে নদের জায়গা দখল করে মার্কেট করে ফায়দা লুটছে। মেয়র বলতে পারবে এখন কীভাবে নদীর জায়গায় মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করা উচিত।
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজার এলাকার এক শতাংশ জমির মূল্য দুই থেকে তিন কোটি টাকা। নদ খননের কাজের স্বার্থে এলাকার লোকজন কোটি কোটি টাকার সম্পদ ভেঙে দিয়েছে। ওই সময় আমাদের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল নদের দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। কিন্তু এখনো প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। মাটি দিয়ে যে রাস্তা করা হয়েছিল সেই রাস্তা দখল করে কেউ কেউ মার্কেট নির্মাণ করছে। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা।
জানতে চাইলে মাধবদী পৌরসভার মেয়র ও সোনার বাংলা সমবায় সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন প্রধান মানিক বলেন, মার্কেট সোনার বাংলা সমিতির জায়গায় করা হয়েছে। এখানে নদীর কোনো জায়গা দখল করা হয়নি। আগে যেই মার্কেটটি ভাঙা হয়েছিল সেখানেই এই মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেকেই এটি নিয়ে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।
তাহলে আগে মার্কেটটি ভাঙা হলো কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এখান দিয়ে না ভাঙলে অন্যদিকে ভাঙা যায় না। এজন্য এখান থেকে ভাঙা শুরু করেছিলাম।
বিষয়টি নরসিংদী সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান কাউছার প্রথমে জেলা প্রশাসনের নজরে আনেন। তিনি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে মার্কেটে লাল দাগ দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু নির্দেশ অমান্য করেই দিনরাত মার্কেট নির্মাণকাজ চলছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে নদের জমির সীমানা নির্ধারণের জন্য কাজ করে।
জানতে চাইলে সহকারী কমিশিনার (ভূমি) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, আমাদের নির্দেশ সত্ত্বেও কাজ বন্ধ না রাখা দুঃখজনক।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ মাসুম বলেন, কমিটি ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন করে কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন দেবে। যদি প্রতিবেদনে অবৈধ দখলের বিষয় আসে আমরা আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।