প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল প্রকল্পটি আড়াই বছরেই শেষ হয়ে যাবে। সারা বছর কাজ করার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত প্রকল্প হাতে নিয়ে দেখা গেল বর্ষা মৌসুমে এ প্রকল্পের কাজই করা যায় না। কোরিয়ান পরামর্শক এ প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তারও ধারণা ছিল না এত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে এ প্রকল্পের কাজ। বছরে মাত্র পাঁচ মাস প্রকল্পটির কাজ করা যায়। প্রকল্প কাজে সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় সমীক্ষার অভাব, তহবিলের অভাবসহ নানা কারণে নৌ-নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি এখন বন্ধ রয়েছে।
দুবলার চর, চর কুকরি-মুকরিসহ প্রকল্পের আওতায় বেশিরভাগই উপকূলীয় এলাকায়। বছরের পাঁচ মাসের বেশি এসব এলাকায় কাজ করা সম্ভব হয় না। এপ্রিলের মধ্যে সবাইকে ফেরত আনার পর নভেম্বর পর্যন্ত কোনো কাজই করা সম্ভব হয় না। শুধু তাই নয়, চর কুকরি-মুকরির যেখানে কাজ করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই নদীভাঙনে মিশে গেছে। অথচ প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার আগে এসব কিছুই হিসাব করেনি নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
‘এস্টাবলিস্টম্যান্ট অব গ্লোবাল মেরিটাইম ডিসট্রেস অ্যান্ড সেফটি সিস্টেম অ্যান্ড ইন্ট্রিগ্রেটেড মেরিটাইম নেভিগেশন সিস্টেম’ শীর্ষক প্রকল্পে উঠে এসেছে এমন দুরবস্থার চিত্র। প্রকল্পটি তৃতীয় সংশোধনীর জন্য আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য জাহাজের সাগর বা নদীতে থাকা জাহাজের গতিবিধি চিহ্নিত করা, যাতে বাংলাদেশের সীমানায় কোনো জাহাজ বিপদে পড়লে দ্রুত উদ্ধার করা যায়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমানায় কোনো জাহাজ বিপদে পড়লে সেটার খবর নিশ্চিত হতে হয় ভারতের কাছ থেকে। প্রথমে এ প্রযুক্তি বিটিসিএলের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার কথা থাকলেও, দুবলার চরের মতো দূরবর্তী জায়গার জন্য আলাদা করে অর্থ দাবি করেছে বিটিসিএল।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ৭টি লাইট হাউজ ও কোস্টাল রেডিও স্টেশন স্থাপনসহ বেশ কয়েকটি লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেয় নৌপরিবহন অধিদপ্তর। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু কাজই যেন শেষ হতে চায় না। ৩৭০ কোটির প্রকল্প গিয়ে ঠেকছে ৭৭৯ কোটি টাকায়। সময় বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ ২ বছরের প্রকল্প যাচ্ছে ১১ বছরে।
প্রকল্পটির সংশোধনের তেমন কোনো সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবুও সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেকের কার্যতালিকায় উঠছে।
প্রকল্প ঘেঁটে জানা যায়, ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ৩৩৩ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ব্যয়ের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৫৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ আরও ৩ বছর বাড়িয়ে জুন ২০২৩ পর্যন্ত নির্ধারণ করে ৩য় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ৩য় সংশোধিত প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৭৭৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন আবু সাইদ মোহাম্মদ দেলোয়ার রহমান গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৪ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও ২০১৮ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি, তাও শেষ সময়ে, সেপ্টেম্বরে। ভূমি অধিগ্রহণ ও ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রকল্প অনুমোদনের পর শুরু হয়েছে। যদিও এসব খারাপ অভিজ্ঞতা থেকেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এখন থেকে কোনো প্রকল্পে আগে ভূমি অধিগ্রহণ ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রকল্পটি বন্ধ পেয়েছি। প্রকল্পটির তহবিল বর্তমানে বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বেতন দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। যে বাড়িতে ভাড়া থেকে কাজ পরিচালনা করছি, সে বাড়ির ভাড়াও দিতে পারছি না।
প্রকল্পটিতে ২৮৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে কোরিয়ার ইডিসিএফ। প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যে রয়েছে ৪ লাখ ৯২ হাজার ৭০৮ ঘনমিটার ভূমি উন্নয়ন, ৫ হাজার ১০ রানিং মিটার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, ১ হাজার ৩৩০ রানিং মিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৭টি সিকিউরিটি গার্ড রুম নির্মাণ, ২ হাজার ৩৮ মিটার ইন্টারনাল এপ্রোচ রোড নির্মাণ, ৬টি উপকূল রেডিও স্টেশনের জন্য ৭৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট স্টিল টাওয়ার নির্মাণ, ইন্টারনাল ইলেক্ট্রিক ওয়ার্কস, ৩টি ১০০ কেভিএ বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ক্রয়।
প্রকল্পটি ঢাকা জেলার ঢাকা সদর উপজেলা, কক্সবাজার জেলার কক্সবাজার সদর উপজেলা, কুতুবদিয়া উপজেলা ও সেন্টমার্টিন উপজেলা, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলা, ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলা, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
মূলত নৌপরিহনের বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের কথা ছিল এ প্রকল্পে। উপকূলীয় এলাকায় ৭টি লাইট হাউজ ও কোস্টাল রেডিও স্টেশন স্থাপন এবং ঢাকায় একটি কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে চলমান জাহাজগুলোর সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ নৌনিরাপত্তা, সিকিউরিটি ও সার্ভিল্যান্স প্রতিষ্ঠা করাই এ প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল। নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও পরিচালনা করা, আন্তর্জাতিক কনভেনশনের চাহিদা পূরণ, আধুনিক নেভিগেশনাল সহায়তা ও ভেসেল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নৌ-নিরাপত্তা প্রসারিত করা, বর্তমান লাইট হাউজ আধুনিকীকরণ ও নতুন লাইট হাউজ স্থাপন, মেরিটাইম সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কার্যক্রমে সমন্বয় করা এর উদ্দেশ্য।
মূল প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ৩ মার্চ একনেক সভায় ৩৭০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়।