যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তথা সরকারের ‘শীতল’ সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। দেশটির মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর দুদিনের সফরে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে এ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শুধু লুর সফরই নয়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা (বিশেষ সহকারী) ও হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল আইলিন লাউবাচারের সফরেও দেশটির সরকারের ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে। তবে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাইডেন প্রশাসনের তরফে এ বার্তা দেওয়া হয়েছে যে আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ দেখতে চায় তারা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নিষেধাজ্ঞা বিষয়েও বার্তা দিয়েছে। তারা চায় র্যাবের সংস্কার অর্থাৎ বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ ও র্যাবের পক্ষ থেকে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন করা না হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, র্যাবের নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন আলোচনা এবং লবিস্ট নিয়োগের ফলাফল ইতিবাচক। যুক্তরাষ্ট্র চায় র্যাবের সংস্কার এবং এ লক্ষ্যে তারা সরকারকে কিছু প্রস্তাবও দিয়েছে। র্যাব সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়েছে।
র্যাব সংস্কারের বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শেই র্যাব গঠন করা হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলে সেটা দেখা হবে। র্যাবের সব কাজ ভালো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডোনাল্ড লুর সফর সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১০ ডিসেম্বর বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হয়েছে। আর র্যাবের সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইতিবাচক সাড়া এ দুটি বিষয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশগুলো যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা চায় সে ব্যাপারেও সরকারপ্রধানের প্রতিশ্রুতির কথা জানানো হয়েছে লুকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুদিনের সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে লু দেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র, বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের অনুমতি এবং আগামী সংসদ নির্বাচনে সরকারের মনোভাব নিয়ে জানতে চেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাদের সরকার বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে তার বাস্তবায়নের ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। লু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কারও পক্ষ অবলম্বন করছে না এবং করবেও না। যুক্তরাষ্ট্র চায় সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক চর্চা।
বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড লু। যৌথ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় করতে এসেছেন এবং সেক্ষেত্রে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিনিধির বৈঠকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার, সমাবেশ করার অধিকার, ভোটার ও বিরোধীপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো থেকে বিরত থাকা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। ডোনাল্ড লু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বিষয়ে যখনই কোনো সমস্যা দেখা দেবে যুক্তরাষ্ট্র সে বিষয়ে পরামর্শ দেবে। তারা বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবশ্যই দাঁড়াবে। বাংলাদেশের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করবে তারা। মানবাধিকারের বিষয়টি তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
ডোনাল্ড লুর এ সফর সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। লুর সঙ্গে বৈঠকেও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। কীভাবে সম্পর্কটাকে আরও অর্থবহ করা যায়, এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের মধ্যে কোনো প্রশ্ন তৈরি হলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময়ই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। এ বিষয়টি আমরা আবারও মার্কিন প্রতিনিধিকে জানিয়েছি। আওয়ামী লীগ সংবিধানের রক্ষক এবং সংবিধান অনুযায়ী আমরা নির্বাচন করব। আওয়ামী লীগ সবসময় গণতান্ত্রিক পন্থায়ই সরকারে এসেছে। এটা আমরা সবাইকে বলে আসছি এবং জনগণও সেটি জানে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বিদেশিরা আমাদের গণতন্ত্র ও সুশাসন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং কোনো প্রশ্ন এলে তা জানতে চাইতে পারে কিংবা পরামর্শ দিতে পারে। কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রও তাই চায়। কিন্তু আমরা দেখেছি বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো বারবার বিদেশিদের কাছে ধরনা দিচ্ছে। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা মোটেও ঠিক না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডোনাল্ড লুর সফরে এবং তিনি যে ব্রিফিং দিয়েছেন তাতে এটা স্পষ্ট হয়েছে তারা বাংলাদেশের নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না এবং তারা কারও পক্ষে না। তারা তাদের পর্যবেক্ষণের বিষয় জানিয়েছে এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আমি মনে করি এটি একটি ইতিবাচক সফর।’