বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নে তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে গোলাগুলি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সেখানে রোহিঙ্গাদের দুটি সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলি হয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত তা চলে। পরে রাত ৯টা থেকে তমব্রুর কোনারপাড়া শূন্যরেখার রোহিঙ্গা শিবিরের পূর্বদিক আরসা আর পশ্চিম দিকে আরএসও সশস্ত্র অবস্থান নিলে দুপক্ষের মধ্যে ফের প্রচ- গোলাগুলি শুরু হয়। অন্যদিকে রাত ১০টার দিকে শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অবশিষ্ট তিন শতাধিক জনশূন্য ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
এর আগে গত বুধবার সকাল থেকে রোহিঙ্গাদের দুটি সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে দিনভর থেমে থেমে গোলাগুলির পর সন্ধ্যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লাগার প্রথম ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার পর ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা পরিবাররা দুটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, আগুনে ক্ষতিগ্রস্তসহ আনুমানিক ২০০ রোহিঙ্গা পরিবার তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জুনিয়র হাই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া কিছু পরিবার বুধবার রাতে বিক্ষিপ্তভাবে মিয়ানমারেও চলে গেছে।
তমব্রু গ্রামের বাসিন্দা আবু সৈয়দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিরো পয়েন্টে থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অধিকাংশ ঝুপড়িঘর পুড়ে ছাই গেছে। এরপর থেকে ওখানকার বসবাসকারী রোহিঙ্গারা পাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরে যায়নি।’
গতকালের গোলাগুলিতে কেউ হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী। এর আগে বুধবার ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলা গোলাগুলিতে কমপক্ষে তিনজন নিহত হন। অন্যান্য দিনের তুলনায় উখিয়ার বালুখালী টিভি টাওয়ার, উখিয়ার ঘাট কাস্টমসসংলগ্ন মোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের তৎপরতা বেশি ছিল। এ সময় বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি করতে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে সীমান্তে বসবাসকারী লোকজনের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোড়ে মোড়ে অবস্থান করছে।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শফিকুল ইসলাম গতকাল রাতে বলেন, ‘রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোলাগুলি বাড়ছে। মানবশূন্য বসতিতে আগুন জ¦লছে। এ নিয়ে আমরা স্থানীয়রা আতঙ্কে আছি। তবে আশার কথা হচ্ছে সীমান্ত এলাকার বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘গত দুদিনের গোলাগুলির ঘটনায় গ্রামবাসী আতঙ্কে। কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।’
আন্তর্জাতিক রেড ক্রিসেন্ট কমিটির (আইসিআরসি) অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার ক্যাম্পটিতে ৫৩০টি ঘর ছিল। সেখানে চার হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করত। তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা দিল হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ একদল মুখোশধারী এসে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর ছেলেমেয়ে নিয়ে পালিয়ে আসি।’
এ ব্যাপারে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘শূন্যরেখার পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে রয়েছে।’
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমেন শর্মা বলেন, ‘অধিকাংশ রোহিঙ্গাদের ঝুপড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৩৩টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। অনেকে বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় বাস শুরু করে। তাদের সেখানে সহায়তা করে আসছিল আইসিআরসি।’