হল সুবিধায় মাত্র ৩৬ শতাংশ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এসে ভর্তি হন। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের চাওয়া থাকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো হলে থাকার সুযোগ পাওয়া। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আবাসিক হল না থাকায় ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই সে সুবিধা পান না। মাত্র ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান। এরমধ্যে ৫৯ শতাংশ ছাত্র ও ৪১ শতাংশ ছাত্রী। আর শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ আবাসিক সুবিধা ভোগ করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৮তম বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০২১ সালের তথ্য নিয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। ওই বছর ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। এরমধ্যে তিনটি অ্যাফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে প্রতিবেদনে ৪৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলেন ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৫ জন। এরমধ্যে আবাসন সুবিধা পান ১ লাখ ৪ হাজার ৮৫২ জন। অর্থাৎ শতকরা ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। আর ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৩৬ জন। এরমধ্যে আবাসিক সুবিধা ভোগ করছেন ২১ শতাংশ শিক্ষক। আর ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৮৩৩ জন। এরমধ্যে ৩ দশমিক ২১ শতাংশ কর্মকর্তা এবং ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ কর্মচারী আবাসিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন সময়ে এখানে আসন সংখ্যা বাড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসির অনুমোদন দিয়েছে। ফলে সেখানে সব শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা নেই। এভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া আসন সংখ্যা বাড়ানোয় সংকট তৈরি হচ্ছে। আমি বলব, এজন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিকল্পিত নীতিই দায়ী।’

অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকেই যে আবাসিক সুবিধা দিতে হবে, তা আইনে নেই। কোনো শিক্ষার্থী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে সে জানে আবাসিক সুবিধা পাবে না। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন সে ধরেই নেয় সে আবাসিক সুবিধা পাবে। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এমন জায়গায় গড়ে উঠেছে, তার আশপাশে থাকার জায়গাও তেমন নেই। আবার ঢাকায় হলে তাদের অনেক টাকা খরচ করে থাকতে হয়। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক সুবিধা থাকলে তার পড়ালেখার জন্য সুবিধা হয়।’

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, আবাসন সুবিধার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। আর শতভাগ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পান মাত্র দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর একটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যটি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৩ শতাংশ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৯ শতাংশ ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা রয়েছে।

সূত্র জানায়, ৪৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মোট হল বা ডরমিটরির সংখ্যা ২৬০টি। এরমধ্যে ১৫৯টি হল ছাত্রদের জন্য, যেখানে থাকেন ৬১ হাজার ৭০১ জন। আর ১০১টি হল ছাত্রীদের জন্য, যেখানে থাকেন ৪৩ হাজার ১৫১ জন। সবচেয়ে বেশি ৩৬টি হল রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, এরপরও তাদের মাত্র ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা হলে থাকলে খুব কম টাকায় মাস চালাতে পারেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হল না থাকায় প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই গণরুম বা রাজনৈতিক রুমের সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ৮ জনের একটি রুমেই গাদাগাদি করে ৪০ জন পর্যন্ত থাকেন। আবার এই সুযোগে ছাত্রনেতারা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে রুমে তুলে মাসে বা বাৎসরিক টাকাও আদায় করে থাকেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলোতে নানা ধরনের নৈরাজ্যের সৃষ্টি হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ৩৭ হাজার ৪২৮ জন ও হল রয়েছে ২৩টি। এতে ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা আছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ৯টি হলে ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫টি হল থাকলেও সেখানে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী থাকতে পারেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ শতাংশ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩২, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৬, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৪, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৫, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৩, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩১, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ৬, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে ১৭, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৬, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে। এর বাইরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১১ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এখনো কোনো ধরনের আবাসিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি।

এছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাসিক সুবিধা পান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৭ শতাংশ। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ শতাংশ শিক্ষক আবাসন সুবিধা পান। কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাসন সুবিধা পান শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ শতাংশ। আর কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাসিক সুবিধা পান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে।