রাজধানী ঢাকায় গত বছর বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ০৮ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ ছিল খাদ্যবহির্ভূত খাতে। খাবারে ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। ২০১১ সালের পর গত বছর মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। শহরের এবং গ্রামীণ উভয় মূল্যস্ফীতিই বেড়েছে, যা বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের দুর্দশা বাড়িয়েছে।
এসব তথ্য জানিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে প্রায় ১৭টি পণ্য সরাসরি অবদান রেখেছে।
গতকাল শনিবার পণ্য ও সেবার মূল্যবিষয়ক প্রতিবেদন ২০২২ প্রকাশ উপলক্ষে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। ঢাকা মহানগর (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত) ১১টি বাজার থেকে ১৪১টি খাদ্যসামগ্রী, ৪৯টি খাদ্যবহির্ভূত পণ্য এবং ২৫টি পরিষেবার দৈনিক দাম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মূল তথ্য উপস্থাপন করেন ঢাকার বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর। তার মতে, চাল, আটা, ডাল, বেকারি পণ্য, চিনি, মাছ, ডিম, দেশি মুরগি, ভোজ্য তেল, আমদানিকৃত ফল, চা ও কফি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা দুধ, পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ও পরিবহনে খরচ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
ড. মাহফুজ কবীর জানান, ২০২২ সালে মূল্যস্ফীতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। রাজধানী ঢাকায় গত বছর সাধারণ পরিবারের তুলনায় নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর গড় মূল্যস্ফীতির চাপ (৯ দশমিক ১৩ শতাংশ) কম ছিল। বার্ষিক খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতি (যথাক্রমে ১০ দশমিক ৪১ এবং ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ) কম ছিল। যদিও উভয় শ্রেণির পণ্য ও সেবা মৌলিক প্রকৃতির ছিল। এ ছাড়া মৌসুমি প্রভাব এবং বাজারে সরবরাহের পর্যাপ্ততার কারণে কিছু খাদ্যদ্রব্যের দাম ওঠানামা করে। ভোগের ঝুড়িতে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার অংশ খাদ্যপণ্যের তুলনায় কম ছিল। খাদ্যবহির্ভূত জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি বেশির ভাগই স্থায়ী প্রকৃতির ছিল। তাই খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি খাদ্য মূল্যস্ফীতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি থেকে ‘সাধারণ’ মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। মে মাসে কিছুটা কমার পর তা আবার জুন থেকে বাড়তে শুরু করে।
জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার পর হঠাৎ করে আগস্টে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় উল্লেখ করে ড. মাহফুজ কবীর আরও জানান, পরবর্তী দুই মাস বাড়ার পর ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসে। জানুয়ারির তুলনায় অক্টোবরে ‘সাধারণ’ মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি ছিল। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কম ছিল, যা আগস্টে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। ডিসেম্বরে তা কমে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্যাবের তথ্য মতে, প্রধানত মৌসুমি সবজির সহজলভ্যতা, আমন ধানের বাম্পার ফলন এবং মাছ-মাংসের দাম কমে যাওয়ায় ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে। বছরের শুরু থেকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়তে দেখা গেছে।
ক্যাবর সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘দেশে মাথাপিছু আয় বাড়লেও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় বাড়েনি। এই আয় বেড়েছে উচ্চবিত্তদের। করোনা-পরবর্তী অনেক মানুষের আয় কমেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে প্রভাব পড়েছে।’ দ্রব্যের দাম একবার বাড়লে আর কমার আশা করা যায় নাÑ এমন মন্তব্য করে তিনি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় যাতে বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তা না হলে সংকট আরও বাড়বে।
ক্যাবের মতে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে রক্ষা করতে সরকারকে শহরাঞ্চলে সামাজিক সুরক্ষা স্কিম বাড়ানো উচিত। বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজার মনিটরিং বাড়ানো উচিত। সিন্ডিকেশন ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ক্যাব, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।