আবারও সড়ক ভিজল শিক্ষার্থীর রক্তে

রাজধানীর সড়কে আবারও ঝরল শিক্ষার্থীর প্রাণ। এবার বেপরোয়া বাসের চাপায় প্রাণ গেল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্দান ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নাদিয়ার (২৪)। গতকাল বেলা ১২টায় রাজধানীর প্রগতি সরণিতে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ প্রাণ হারিয়েছিলেন আবরার নামে এক শিক্ষার্থী। এর আগে ২০১৮ সালে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। এই দুর্ঘটনার পর রাজধানীজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে কর্র্তৃপক্ষ তাদের ‘বুঝ’ দিয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। কিন্তু এরপরও থামেনি গাড়ির বেপরোয়া চলাচল। যার ফলে গতকাল সড়কে প্রাণ গেল নাদিয়ার।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় উত্তরা থেকে আসা ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস প্রথমে মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে মোটরসাইকেল থেকে মেয়েটি ছিটকে পড়ে যান। এ সময় বাসচালক তার গায়ের ওপর দিয়ে বাসটি চালিয়ে দেন। পেছনের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ঘাতক বাসকে জব্দ করলেও পালিয়ে গেছেন বাসচালক ও তার সহযোগী।

ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম আছাদুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, উত্তরার দিক থেকে আসা ভিক্টর বাসের ধাক্কায় মারা যান নাদিয়া। তবে রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে, নাকি বাস থেকে নামতে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা জানা যায়নি। এ ঘটনায় বাসটির অজ্ঞাতপরিচয় চালক ও হেলপারকে আসামি করে মামলা করেছেন তার বাবা।

২০১৯ সালের ১৯ মার্চ একই স্থানে বেপরোয়া বাস পিষে মারে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের মেধাবী ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরীকে। সড়কের ওই হত্যাকা-ের পর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তা আবরারের সহপাঠীরা অবরোধ করে রাখেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলে লাগাতার আন্দোলন। আন্দোলনের মুখে ওই স্থানে ফুটওভারব্রিজ করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানী কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়া খানম ওরফে মিম। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। যানবাহন ভাঙচুর করেন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করলেও সড়কে গাড়ির বেপরোয়া চলাচল বন্ধ করা যায়নি। এরই ফলে গতকাল আবারও শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরল সড়কে।

নিহত নাদিয়ার বাবা, মা ও তার ছোট দুই বোন নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকায় থাকেন। তার বাবার নাম জাহাঙ্গীর মৃধা। তিনি একটি পোশাক কারখানার অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার। মা পারভিন বেগম গৃহিণী। ছোট দুই বোন সামিয়া ও মারিয়া। তারা নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করে।

বাবা জাহাঙ্গীরনগর মৃধা বলেন, নাদিয়া ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জের মহিলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে। এ বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নর্দান ইউনিভার্সিটিতে মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দিই। নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে ক্লাস করা কষ্টের, তাই মেয়েকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের একটি ছাত্রী হোস্টেলে তুলে দিই। এক সপ্তাহ আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরা আসে। এসেই এই ঘটনা ঘটল। আমি ঢাকায় না দিলে আমার মেয়ে মারা যেত না।

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান তৌফিক বলেন, ভর্তির পর গত ১২ জানুয়ারি আমাদের প্রথম ওরিয়েন্টেশন ক্লাস হয়। এরপর আর ক্লাস হয়নি। বিশ্ব ইজতেমার যানজটের কারণে ক্লাস স্থগিত। তবে কেউ কেউ ঘুরতে ইউনিভার্সিটিতে আসত। এই সপ্তাহ থেকে ক্লাস হওয়ার কথা রয়েছে। আমরা সহপাঠীরা এখনো কেউ কাউকে ভালো করে জানি না। এর মধ্যেই এই ঘটনা ঘটল।

এ ঘটনার পর বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে নর্দান ইউনিভার্সিটির কয়েকশ শিক্ষার্থী সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের সহপাঠী হত্যার বিচার চাই। বিচারের দাবিতে আমরা মহাসড়ক অবরোধ করেছি। প্রতিনিয়তই মহাসড়কে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। এর আগেও শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে নেমে আন্দোলন করেছে। কিন্তু মহাসড়কে মৃত্যু কমেনি। পরে সন্ধ্যায় পুলিশ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয়।

তবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আজ প্রতিবাদ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের (নিসআ) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ইনজামুল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়ক নিরাপদ করার জন্য আমরা বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। আমাদের সেসব বিষয় বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো সড়কে কোনো পরিবর্তন হয়নি, আগের মতোই বিশৃঙ্খল চিত্র রয়েছে। যার ফলে আবারও সড়কে শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। কুড়িল বিশ্বরোডে শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদ ও সড়ক নিরাপদের দাবি বাস্তবায়নে আবারও রাজপথে নামব।