অশ্রুসজল চোখে গভীর আকুতিপূর্ণ মোনাজাতের মধ্য দিয়ে রবিবার শেষ হয়েছে দাওয়াতে তাবলিগের ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমা। দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে শুরু হয়ে ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০ মিনিট আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন ভারতের হজরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দের বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ বিন সা’দ কান্ধলভী। ২০ লক্ষাধিক মানুষের কণ্ঠে আমিন ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে তুরাগতীর। দুনিয়া ও আখিরাত, দেশ ও বিশ্বের কল্যাণ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন মুসল্লিরা। তারা আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ ও সবক্ষেত্রে আল্লাহর রহমত চান।
মোনাজাতের প্রথম ১১ মিনিট পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন তিনি। শেষ ১৯ মিনিটে উর্দু ভাষায় দোয়া করেন। এর আগে সমাপনী (হেদায়েতের কথা) বয়ানও করেন তিনি। বাংলাদেশ ছাড়াও ৬৩ দেশের ৯ হাজারে বেশি বিদেশি মেহমান দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা ও আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। মোনাজাতে অংশ নিতে শনিবার রাত থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে। সূর্য উঠতে না উঠতেই কুড়িল-বিমানবন্দর-আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী-কালীগঞ্জ, আশুলিয়া-সাভার ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কসহ বিভিন্ন পথে হাজারও মানুষ হেঁটেই আসতে থাকেন ময়দানের দিকে। এমনকি নারীরাও ভিড় ঠেলে হেঁটে আসেন। মোনাজাতের সময় ইজতেমাস্থলের চারপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মিল-কারখানার ভেতর ও ছাদ, ঘরবাড়ি, বেড়িবাঁধ, বিভিন্ন যানবাহন এবং নৌকায় বসেও মোনাজাতে শরিক হন বহু মানুষ। মোনাজাত শেষে হেঁটেই ফিরতে হয় এদের প্রায় সবাইকে। যে অল্প কজন মানুষ বাস, পিকআপ বা কোনো যানবাহনে উঠতে পেরেছেন তাদের গুনতে হয়েছে বহুগুণ বেশি ভাড়া।
আখেরি মোনাজাতের জন্য রবিবার আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না।
রবিবার বাদ ফজর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা মুরসালিন। তার বয়ান তরজমা করেন মাওলানা জিয়া বিন কাসিম। সকাল সাড়ে ৯টায় হেদায়েতি বয়ান শুরু করেন মাওলানা ইউসুফ বিন সা’দ কান্ধলভী। তা বাংলা তরজমা করেন বাংলাদেশে মাওলানা জিয়া বিন কাসিম।
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মিডিয়া সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সায়েম জানান, যেসব মুসল্লি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে চিল্লায় যাবেন ইজতেমা ময়দানে তাশকিলে কামরায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। রবিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় এক হাজারের মতো তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
১ বদনা পানি ১০ টাকা : রবিবার ইজতেমা ময়দানের আশপাশে প্রতি বদনা পানি ১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। অনেক মুসল্লি প্রতি পাতা পত্রিকা ৫ টাকা করে কিনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশপাশের ফুটপাতে বসে মোনাজাতে অংশ নেন।
অতিরিক্ত ভাড়া : মুসল্লিরা বাড়ি ফিরতে বেশ ভোগান্তিতে পড়েন। টঙ্গী ব্রিজ থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ১০ টাকার ভাড়া একশ টাকা এবং টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত ২৫ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা আদায় করা হয়। বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও কয়েক গুণ বেশি বাস ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ভোগান্তি থাকলেও অভিযোগ নেই : ইজতেমায় অংশ নেওয়া মুসল্লিরা আসা ও যাওয়ার পথে গাড়ি না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হলেও তাতে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে আসা আকবর আলী জানান, সকালে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে ময়দানে এসেছি মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য। আল্লাহর রহমতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না, বরং ভালোই লাগছে।
যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ : ভোর থেকে ইজতেমামুখী সব যানবাহন চলাচল ছিল নিয়ন্ত্রিত। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী ও বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত, ঢাকা-কালীগঞ্জ সড়কের মিরেরবাজার থেকে টঙ্গী পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন চলাচল ছিল সীমিত।
বিশ্ব ইজতেমায় আরও দুই মুসল্লির মৃত্যু: বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে শনিবার রাতে ও রবিবার দুপুরে আরও দুই মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাতে মারা যান আবু তাহের (৬৫), তার পিতার নাম সৈয়দ আলী। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তিনি শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার খিত্তায় মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া রবিবার আখেরি মোনাজাতের পর আরও এক মুসল্লি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার নাম মাসুদুর রহমান (৫৮), তিনি জামালপুরের বকশিগঞ্জ থানা এলাকার রাজা মিয়ার ছেলে। এ নিয়ে ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে মোট সাত মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।
১৯৪৬ সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমা আয়োজন করা হয়। ১৯৬৬ সালে গাজীপুরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বর্তমান ময়দানে স্থানান্তর করা হয় বিশ্ব ইজতেমা। এ বছর ১৩ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১৫ জানুয়ারি রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্বের (জুবায়েরপন্থি) বিশ্ব ইজতেমার সমাপ্তি ঘটে। মাঝে চার দিন বিরতি দিয়ে ২০ জানুয়ারি দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাযের অনুসারী (মাওলানা সাদপন্থি) মুসল্লিরা বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেন। ২২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে এবারের বিশ্ব ইজতেমার পরিসমাপ্তি ঘটে।