হাজার টাকা দিলেই মেলে 'বিশেষ স্টিকার', পুলিশ আটকায় না

দেশের ধনী জেলার তালিকায় শীর্ষে নারায়ণগঞ্জ। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে সারা দেশের মানুষের আসা যাওয়া এ শহরে। সেই সাথে প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আসা যাওয়া তো আছেই। সরকার তাদের জনগণের সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলেও অনেকে এ জেলায় আসেন দু'হাত ভরে টাকা কামাতে, এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী অনেকের। বিশেষ করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নগরবাসীর জানমালের নিরাপত্তায় দিনরাত পরিশ্রম করলেও কিছু কিছু দপ্তরের কর্মকাণ্ড নগরবাসীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এদের জন্য পুরো প্রশাসনের দিকেই আঙুল তুলছে সাধারণ মানুষ।

নারায়ণগঞ্জ শহরে সবচে ভয়াবহ সমস্যা হচ্ছে অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের বেপরোয়া চলাচলে অতিষ্ঠ নগরবাসী। কিছুদিন পূর্বেও শহরের প্রধান সড়কে প্রবেশ করতে পারত না এই 'মিনি দানব' ইজিবাইক। বর্তমানে অবাধে পুরো শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে 'মিনি দানব' ইজিবাইক। ফলে প্রায় প্রতিদিনই একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে শহর ও শহরতলীতে। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের দৌরাত্ম্যে সড়কে দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ ইজিবাইকের স্ট্যান্ড তৈরি করে স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের দাবি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের মতো যানবাহনের কোনো কাগজপত্র না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ইজিবাইকের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনও রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে শহরে ইজিবাইক প্রবেশের ওপর মৌখিক নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হলেও টাকার বিনিময়ে অবাধে শহরে ঢুকছে। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন সড়কে পুলিশের চেকপোস্টও বসতে দেখা গেলেও এগুলোকে আইওয়াশ বলে মনে করছে নগরবাসী। আবার বেশকিছু ইজি বাইক কতিপয় ভূঁইফোড় অনলাইন ও পত্রিকার স্টিকার লাগিয়ে দেদারসে চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গোটা শহরে ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশের সোর্স পরিচয়ধারী ইন্দ্রজিৎ, রায়হান, রাসেল নামের তিন ব্যক্তি। এরা প্রশাসন ও কতিপয় রাজনৈতিক নেতাদের মাসোহারা দিয়ে অবাধে ইজিবাইক চালিয়ে পুরো শহরকে জিম্মি করে রেখেছে।

কয়েকজন ইজিবাইক চালক জানান, এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা করে মাসোহারা দিলে নারায়ণগঞ্জ নগরীর যেকোনো এলাকায় প্রবেশ করা যায়। যেসব ইজিবাইকের মালিকরা মাসোহারা দেন, তাদের অনলাইন পোর্টাল বা পত্রিকার নামে বিশেষ প্রেস লেখা স্টিকার ও টোকেন দেওয়া হয়। স্টিকার লাগানো ইজিবাইক পুলিশ আটকায় না। কিন্তু নিয়মিত মাসোহারার স্টিকার না থাকলে সেই ইজিবাইকগুলোকে আটকে জরিমানা আদায় করে নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়ক, দুই নম্বর রেলগেট, চাষাঢ়া চত্বরজুড়ে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে ইজিবাইকের কারণে। গ্রিন সুপার মার্কেট, সোনার বাংলা মার্কেটের সামনের বঙ্গবন্ধু সড়কে গড়ে উঠেছে অবৈধ ইজিবাইক স্ট্যান্ড। সড়কের মাঝ থেকেই উঠানো হচ্ছে যাত্রী। দুই নম্বর রেলগেট চত্বরে একাধিক ট্রাফিক পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও দেদার ইজিবাইক প্রবেশ করছে।

নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহান সরকার বলেন, বিভিন্ন মিডিয়ার নামসংবলিত স্টিকার লাগানো বা স্টিকার ছাড়া কোনো ইজিবাইকই শহরে প্রবেশের অনুমতি নেই। যদিও সেগুলো প্রবেশ করে। তবে আমরা সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আসলে স্টিকার দিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ কখনো আমাদের কাছে করেনি। যদি কেউ কারও অভিযোগ করে, তবে আমরা ব্যবস্থা নেব।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী শহিদুল ইসলাম বলেন, ইজিবাইক চলাচলের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। অভিযানে আমরা ইজিবাইক আটক করছি। চাঁদাবাজির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি একটি নিয়মিত অপরাধ। এ বিষয় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করবে।

র‌্যাব ১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা গণমাধ্যমকে বলেন, ইজিবাইকে চাঁদাবাজির বিষয়ে আমাদের জানা নেই। কেউ অভিযোগ দিলে আমরা কাজ করতে পারি।