পৃথিবীর ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লবের সময়খণ্ডটিকে সহিংসতার দাইমা হিসেবে দেখেন বিশে^র রাজনীতির ইতিহাস লেখক কেউ কেউ। তারা দেখান ফরাসি বিপ্লব জগৎবাসীকে সন্ত্রাস এবং নাগরিক সেনাবাহিনী দিয়েছে। তারা দেখান নেপোলিয়নের যুদ্ধক্ষেত্রের দর্শনীয় সাফল্যের পেছনে আসল কারণ, তার সেনাবাহিনী ভাড়াটে ছিল না, দেশপ্রেমিকদের দ্বারা গঠিত ছিল। তারা জাতীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে হত্যাকাণ্ড চালাতেন। ফলে মানুষের সামনে হাজির হলো জাতীয়তাবাদী চেতনার একপ্রকার নাগরিক ধর্মমত।
দার্শনিক হেগেল তার ভাবনা লিখেছিলেন ফরাসি বিপ্লব প্রসঙ্গে বিপ্লব সাধনের লড়াইকে মানুষ তাদের নিজের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করেছিল। তাই তারা প্রাণ দিতে রাজি ছিল। মনে হয় হেগেল এভাবে বললে ভালো হতো যে মানুষ স্বেচ্ছায় এ রকম কারণে হত্যাও করতে চায়। হ্যাঁ, বিগত বিংশ শতকে মানুষ যেভাবে গণহত্যা করেছে নানা অজুহাতে, হয়তো বনের কোনো হিংস্র প্রাণীও এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়নি। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, বিপ্লব এবং প্রতিবিপ্লব মোটা দাগে গোটা শতাব্দীজুড়ে ছিল।
বৈশ্বিক রাজনীতির পটভূমিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধির ব্যর্থতা দেখার আগে আমরা আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতার একটি অধ্যায় দেখে নিতে পারি, যেখানে ইউরোপে জাতিগত নির্মূলকরণের ইতিহাস বিধৃত। দেখে নিতে পারি কেন ‘একীভূত স্পেনীয় রাষ্ট্র তার ইহুদিদের কড়া শর্ত দিল খ্রিস্টান হও অথবা নির্বাসনে যাও’? সাফ কথা সেদেশে থাকতে হলে খ্রিস্টান হতে হবে, না হও যদি এ দেশ থেকে পালাও। ‘গুড মুসলিম ব্যাড মুসলিম’ বইটির লেখক মাহমুদ মামদানি বিশ্ববাসীকে জানালেন ‘১৪৯২ সাল। এ বছরে ইউরোপীয় রেনেসাঁর শুরু ও তাদের রাজনীতির আধুনিক রূপের জন্মের সময়খণ্ড সেটা। এ বছরেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস নতুন দুনিয়া খুঁজতে পাল তুলেছিলেন। এ বছরেই রাজা ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলার সৈন্যরা রাজধানী গ্রানাডা জয় করেছিল, যে-গ্রানাডা ছিল পশ্চিমের খ্রিস্টান বলয়ে মুসলিমদের সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল। ফলে ১৪৯২ হয়ে উঠল দুটি সম্পর্কযুক্ত প্রচেষ্টার প্রবেশদ্বার। একটি হলো, একটি জাতির ঐক্য, অন্যটি বিশ্বজয় বা সাম্রাজ্য বিস্তার।’
মামদানি আরও জানালেন ‘জাতি একীকরণের ফলে জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়ে গেল। এ যুগে, রাজনৈতিক আধুনিকতা গণতন্ত্রের সূচনার সঙ্গে সমান করে দেখা হয়। কিন্তু উনিশ শতকের রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা বিশেষত ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, রাজনৈতিক আধুনিকতা নিরূপিত হয়, রাষ্ট্রের সহিংসতা একক কর্র্তৃত্বের দ্বারা একচেটিয়া হয়ে গেলে। জাতিরাষ্ট্রে আগের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সহিংসতা একত্র করে, অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক সব শত্রুকে এক দুর্দান্ত ধাক্কা দিতে সক্ষম। এটা ছিল তাদের একটি সুশীল সমাজ তৈরির রাজনৈতিক পূর্বশর্তও।’
‘সংস্কৃতি ও বর্ণের দিক দিয়ে জাতির রাজনৈতিক আধুনিকতার চিন্তার দুয়ারে তখন ইউরোপ। ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলার স্পেনে, যে-জাতির পরিচয় সর্বাগ্রে খ্রিস্টান। স্পেনের একীকরণ শুরু হয়েছিল জাতিগত নির্মূলকরণের মাধ্যমে। ১৪৯২ সালেই রাজা ফার্দিনান্দ এবং রানী ইসাবেলা স্পেন থেকে ইহুদিদের সরানোর আইনে (এডিক্ট অব অ্যাক্সপালশন) স্বাক্ষর করেছিলেন। একীভূত স্পেনীয় রাষ্ট্র তার ইহুদিদের কড়া শর্ত দিলে প্রায় ৭০ হাজার স্পেনীয় ইহুদি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে স্পেনে থেকে গিয়েছিল। তাদের এই থাকা নিরাপদ ছিল না। তদন্তের দ্বারা জর্জরিত হয়েছিল। অভিযোগ এনেছিল ওরা খ্রিস্টান জাতিরাষ্ট্রের প্রতি আন্তরিক না। আনুমানিক ৫০ হাজার উত্তর আফ্রিকা ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বলকান প্রদেশগুলোতে চলে গিয়েছিল। সেখানে তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। বাকি প্রায় ৮০ হাজার সীমান্ত পেরিয়ে পর্তুগালে প্রবেশ করেছিল। স্পেন থেকে এ তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে। তখন একের পর এক ইউরোপের একেক অংশ থেকে ইহুদিদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। ১৪৯৯ সালে, মানে ইহুদি বের করার আদেশের সাত বছর পরে, স্পেন সেদেশের মুসলমানদের একই ধরনের শর্ত দিয়েছে: খ্রিস্টান হও অথবা চলে যাও। সুতরাং আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাসও বর্ণের ইতিহাস হিসেবে পড়া যেতে পারে।’ কিন্তু পরে বহু কারণে কিংবা ‘ধাক্কা মারলে ধাক্কা খেতে হয়’ এমন বাস্তবতার কারণেই হয়তো-বা রাষ্ট্রীয়ভাবে তাড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা থেকে বের হতে হয় ইউরোপকে। যদিও বর্ণবিভেদ আমজনতার মধ্যে সেখানে শেষ হয়ে যায়নি।
এখন আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার জায়গাগুলো দেখি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান তার সেই বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘সং অব মাইসেলফ’ এর এক জায়গায় বলেছিলেন, ‘ডু আই কন্ট্রাডিক্ট মাইসেলফ? ইয়েস আই ডু’ (আমার মধ্যে কি স্ববিরোধ আছে? হ্যাঁ আছে)। সহজ কথায় এর অর্থ আমার যা করা উচিত না, আমি তা করি। প্রশ্ন হলো কেন করি বা কেন মানুষ করে? আত্মরক্ষার্থে? তাই যদি হয়, আত্মরক্ষার্থে যা করা উচিত না, তা করলে শেষ রক্ষা হয় কি? এ প্রশ্ন থেকে যায়।
মাহমুদ মামদানি ১৯৭৫ সালে, তানজানিয়ার দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ প্রভাষক। বছরটি বেশ গুরুত্ববহ ঔপনিবেশিকতামোচনের কাল হিসেবে। এ বছর আমেরিকা ইন্দোচীনে পরাজিত হয়। এ বছরেই আফ্রিকা মহাদেশের মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, গিনি থেকে পর্তুগিজরা বিদায় হয়েছে। এই বছরেই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে স্থানান্তর হয়। তখন কৌশলগত প্রশ্নটি ছিল, পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের টুকরোগুলো কে নেবে সোভিয়েত না যুক্তরাষ্ট্র? প্রধান কেন্দ্র স্থানান্তর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল পরিবর্তন হয়। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস ইন্দোচীন যুদ্ধের শিক্ষা বিবেচনায় নিয়ে শীতল যুদ্ধ স্থানান্তর করতে বলে। সেই শিক্ষা নিক্সন মতবাদ হিসেবে আইনসভায় গৃহীত এবং তা ক্লার্ক সংশোধনী আকারে পাস হয়। নিক্সনের মতবাদে ছিল ‘এশিয়ার যুদ্ধ এশিয়ার ছেলেদের করা উচিত’। এ শিক্ষা আমেরিকা পেয়েছে ইন্দোচীনে এক যুগের বেশি জড়িয়ে থেকে কোনো লাভ না হওয়াতে। বিশেষত তুলনামূলক লাওসে প্রক্সি যুদ্ধ সফল হলেও ভিয়েতনামে ব্যর্থতার চাপে সেই সফলতাও ব্যর্থ হয়েছে। ভিয়েতনামে সরাসরি যুদ্ধে নামে আমেরিকা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে ভিয়েতনামি কমিউনিস্ট গেরিলাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু লাওসে এসে আমেরিকা দেখে তার হাত বাঁধা ১৯৬২ সালের চুক্তি অনুযায়ী মস্কোর সঙ্গে। সেই চুক্তি মোতাবেক আমেরিকান সৈন্য লাওসে প্রবেশ করতে পারে না। উপায় নেই দেখে আমেরিকা তাৎক্ষণিকভাবে যা মাথায় আসে তা করে লাওস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
উল্লেখ্য, ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৬৪ সালে, যখন জনসন প্রশাসন দাবি করল দুই আমেরিকান ডেস্ট্রয়ার আঘাত করেছে উত্তর ভিয়েতনামিদের টর্পেডো টনকিন উপসাগরে। আমেরিকান সংবাদ মাধ্যমে একটি চিত্র প্রকাশ পেল, যেখানে দেখানো হয় যুক্তরাষ্ট্রকে অপমান করা হয়েছে। তাই এর একটা জবাব দেওয়া উচিত দাবি করা হয় প্রভাবশালী মিডিয়াতে। মাহমুদ মামদানি জানালেন, ‘প্রেসিডেন্ট জনসন উত্তর ভিয়েতনামিদের ওপর বোমা মারা শুরু করেন। জোরেশোরে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কংগ্রেসের দুই হাউজ থেকে সেনা পাঠানোর অনুমোদন দিতে বললেন। দ্রুতগতিতে কাজ হলো, প্রেসিডেন্ট দুই হাউজ (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেট) থেকেই আক্রমণের অনুমোদন পেয়ে গেছেন। অতঃপর যে খবর পাওয়া গেল, যে ডেস্ট্রয়ারের নাবিকরা জানিয়েছিলেন তারা টর্পেডো দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, তারাই পরে জানালেন আক্রান্ত হওয়ার খবরটি বানোয়াট ছিল। কিন্তু আমেরিকা অন্য হিসাব মাথায় নিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। কারণ আমেরিকার প্রধান প্রতিপক্ষ রাশিয়া। ডেস্ট্রয়ার আক্রান্তের খবর পেয়ে তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যেন পেয়ে গেলেন ব্ল্যাংক চেকÑ বিস্তর শক্তি প্রয়োগের সুযোগ। কিন্তু সফল হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ করল যুক্তরাষ্ট্র উত্তর ভিয়েতনামে। নিরবচ্ছিন্ন বোমা ফেলতে থাকল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো, শিল্প কারখানাগুলো ধ্বংস করতে থাকল এ আশায় যে উত্তর ভিয়েতনামিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
কিন্তু ব্যর্থ হলো আমেরিকা আশানুরূপ ফল এলো না। প্রেসিডেন্ট জনসন দক্ষিণ ভিয়েতনামে কমব্যাট সৈন্য নামালেন। নতুন নতুন অপারেশন করল। ‘সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়’, ‘বডি কাউন্ট’ ইত্যাদি। কিন্তু ব্যর্থ হলো আমেরিকা। ছোট ছোট ব্যর্থতাগুলো বিশাল ব্যর্থতায় উন্নীত হলো। সেখানে তাদের ‘আমেরিকানাইজেশন’ হয়ে গেল ঐতিহাসিক ‘ভিয়েতনামাইজেশন’। প্রসঙ্গত, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ ২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুত্রজায়াতে ওআইসি-র সম্মেলনে বলেছিলেন- Jews rule the world by proxy. They get others to fight and die for them. কথাটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আসার পর পক্ষে-বিপক্ষে বেশ হইচই হয়েছিল। সিএনএন-র রিপোর্টে বলা হয়, আমেরিকা ও ইসরায়েল মাহাথিরের কথাকে ‘পোলারাইজিং রেটোরি’ বা ‘নতুন অর্থের চটকদার বুলি’ বিবেচনা করেছিল। মাহাথির ঠিক ধরতে পেরেছিলেন ইহুদি পরিচয়ের জায়নবাদীরা অপরের মাধ্যমে দুনিয়া শাসন করছে। আমেরিকার একজন বিখ্যাত ইহুদি সাংবাদিক, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উদঘাটনের অন্যতম অনুসন্ধানী কার্ল বার্নস্টাইন ২০১৩ সালের ৪ মে এমএসএনবিসি টিভি’র ‘মর্নিং জো’ টক শো-তে সাফ বলেছিলেন, ইসরায়েলি নিও-কনজার্ভেটিভেরা আমেরিকাকে ইরাক যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছিল তাদের স্বার্থে। ইনি সেই বার্নস্টাইন, যিনি আর বব উডওয়ার্ড মিলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রশাসনের ‘ডার্টি ট্রিক্স’ বের করে দিয়েছিলেন, যা ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ নামে খ্যাত। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এভাবে ভেতরে এবং বাইরে বিস্তর ব্যর্থতা আছে আমেরিকার।
লেখক: কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক
sarwarch@gmail.com