অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম হলো চাহিদা আর জোগানের ভারসাম্য থেকেই বাজারে স্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের দেশের মুক্তবাজার অর্থনীতি এমনই মুক্ত যে, কেবল চাহিদা আর জোগানই নয়, এক অদৃশ্য হাত রয়েছে যা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। খুচরা ব্যবসায়ী, দোকানি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এই অদৃশ্য হাতকে সিন্ডিকেট হিসেবে চেনে। চাল, ডাল, চিনি কিংবা ভোজ্য তেলসহ সব নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণেরই নানা সিন্ডিকেট আছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করে দেশের চিনির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। চিনির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকে ব্যবসায়ীরা খোলা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম বাড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ মাসে সরকারি হিসেবে কেজিপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ২৯ টাকা।
শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘মূল্যবৃদ্ধিতেও কাটেনি চিনির সংকট’ ও ‘রোজার আগে দাম বাড়ছে কেজিতে ৫ টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদন দুটি থেকে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে বাজারে চিনির চরম সংকট চলছে। এর মধ্যেই দুই দফায় কেজিপ্রতি ২৮ টাকা বাড়িয়েছে চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। রোজা শুরুর আগের মাস ফেব্রুয়ারি থেকে আরেক দফা দাম বাড়নোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরএ)। নতুন দামে প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ১০৭ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনি ১১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। চিনি সরবরাহ ও দামের বিষয়ে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি চিনি প্রক্রিয়াজাতকরণ করে থাকে। তাদের কারণে বাজারে চিনির কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে সরকারের উচিত হবে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।’ রমজানের পণ্যগুলোর মধ্যে চাহিদার শীর্ষে থাকে চিনি। রোজাদারদের স্বস্তির জন্য চিনির বাজার স্বাভাবিক হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। আশা করব ভোক্তার কথা চিন্তা করে রমজানের আগেই যেন সরকার দ্রুত চিনির বাজার স্বাভাবিক করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সংস্থার নজরদারি বাড়ানো উচিত। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিনি পরিশোধনকারী মিলগুলোতে অধিদপ্তরের নজর রয়েছে। তবে লোকবল সংকটের কারণে মিল থেকে বাজারে আসা পর্যন্ত কোনো চক্র চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কি না তা জানা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ এ জন্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপর হওয়া জরুরি, যাতে করে চিনি সংকটের পেছনে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা যায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী চিনির মূল্যবৃদ্ধিকে সঠিক সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেছেন, ‘হিসাব-নিকাশ করে চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে। এটা যদি সমন্বয় করা না হয় তাহলে ফল ভিন্ন হবে। বাজারে চিনি পাওয়াই যাবে না।’ রমজানের আগে চিনির দাম বৃদ্ধির খারাপ প্রভাব পড়বে বাজারে। মন্ত্রীর কথা সঠিক ধরে নিলেও শুল্ক কমিয়ে চিনির দাম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অন্যদিকে, অবিলম্বে সরকারি চিনিকলগুলোকে পূর্ণ উৎপাদনশীল করা এবং বন্ধ চিনিকলগুলোকে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। রোজা বা রমজান সংযমের মাস বলে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশে রোজার মাসে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি দেখে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যাবে না যে ব্যবসায়ীরা মুনাফার ক্ষেত্রে সংযম করছেন বা সংযত আছেন। রোজার মাসে প্রধানত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে। প্রতি বছর ব্যবসায়ীদের ঘুরেফিরে একই যুক্তি- বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে, আমদানি খরচ বেড়েছে, পরিবহন খরচ বেড়েছে প্রভৃতি। সাধারণ মানুষ দুঃখ করে বলেন, বাজারে কোথায় সংযম? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন কারোরই যেন কিচ্ছু করার নেই! অথচ কোন প্রক্রিয়ায় আমদানিকারক-মজুদদার-পাইকারি বিক্রেতারা চিনির মতো নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে আর সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা বিবিধ সরকারি দপ্তরের কারোরই অজানা থাকার কথা নয়। সরকারের সংস্থাগুলো (আইন, বিধি, নীতিমালা, নিয়ন্ত্রক-তদারক সংস্থা) সক্রিয় থাকলে এ পরিস্থিতি হয় না। বাজার তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ একদিনের কাজ না; আমরা চাই সরকার এ বিষয়ে ৩৬৫ দিনই সতর্ক-সোচ্চার থাকুক। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবশ্যই কঠোর হস্তক্ষেপ দরকার। ভাবা দরকার যে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো থেকে শুরু করে সরকারের সাম্প্রতিক কোনো সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে না। সাধারণ মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে।