সংকট কাটিয়ে আশা জাগাচ্ছে কুমিরের খামার

ময়মসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবের গ্রামে গড়ে ওঠা ‘রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড’ নামের বাণিজ্যিক কুমিরের খামারটি মালিকানা বদলসহ নানা কারণে সংকটে পড়ার পর বর্তমানে ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে উঠছে। আদালতের হস্তক্ষেপে খামারটি এখন অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে খামারে প্রায় তিন হাজার কুমির রয়েছে। এরমধ্যে রপ্তানি উপযোগী রয়েছে প্রায় ৫০০টি কুমির। বাণিজ্যিক এ খামার  থেকে হিমায়িত কুমির ও কুমিরের চামড়া বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

জানা যায়, ২০০৩ সালে ভালুকার উথুরা ইউনিয়নের নিভৃতপল্লী হাতিবের গ্রামে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ একর জমির ওপর কুমিরের খামারটি গড়ে তোলেন মেজবাউল হক ও মোস্তাক আহম্মেদ নামে দুই ব্যক্তি। ৪ একর জমির মাটি কেটে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কুমিরের বাস উপযোগী ১৪টি পুকুর কেটে তলদেশ পাকা ও ৩ ফুট উঁচু প্রাচীর করে ওপরে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৭৫টি কুমির আমদানি করা হয়। পরে খামারে কুমিরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০১০ সালে জার্মানিতে ৬৭টি হিমায়িত কুমির রপ্তানি করা হয়। পরে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫০৭টি কুমিরের চামড়া জাপানে রপ্তানি করে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা আয় হয়। খামারটি গড়ে তোলার শুরুতে ৩৬ শতাংশ শেয়ার মেজবাউল হকের, ১৫ শতাংশ শেয়ার মোস্তাক আহম্মেদের এবং বাকি ৪৯ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ প্রকল্পের ঋণ নেওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নামে ছিল। পরে আর্থিক সংকটের কারণে খামার পরিচালনায় ব্যঘাত ঘটলে ২০১২ সালে খামারের সব শেয়ার কিনে নেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ঋণখেলাপি বর্তমানে ভারতের কারাগারে আটক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর খামারের নামে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেন। খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পি কে হালদারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হলে কুমিরের খামারটি আবার সংকটে পড়ে। খাদ্য সংকট ও পরিচর্যার অভাবে ২০২০-২১ সালে প্রায় এক হাজার কুমির মারা যায়। যে কারণে খামারটি ব্যাপক অনিশ্চয়তার মধ্যে লোকসানে পড়ে যায়। পরে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে নাঈম আহাম্মেদকে চেয়ারম্যান ও এনাম হককে ব্যবস্থাপনা পরিচালক করে ৪ সদস্যের খামার পরিচালনা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। ওই কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হওয়ায় বর্তমানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কুমির খামারটি।

খামার সূত্রে জানা যায়, বিদেশে পুরুষ কুমিরের চামড়ার কদর তুলনামূলক বেশি। কুমিরের বয়স দুই বছর পূর্ণ হলে চামড়া বিক্রয়োপযোগী হয়। খামারে কুমিরের খাবার হিসেবে মুরগির মাংসের পাশাপাশি, গরুর মাংস ও মাছ দেওয়া হয়।

এদিকে কুমিরের খামারটি দেখতে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। খামারটি দেখতে টিকিটের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। চলতি জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে দর্শনার্থীদের প্রবেশ মূল্য ১৫০ টাকা এবং ৮ বছর পর্যন্ত শিশুদের প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

খামারের ম্যানেজার আবু সাইম মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে খামারটির আয়তন দাঁড়িয়েছে ২১ একর জমির ওপর। রপ্তানিযোগ্য প্রায় ৫০০ কুমিরসহ বর্তমানে খামারটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার কুমির রয়েছে। রপ্তানিযোগ্য কুমিরগুলো আলাদা শেডে রাখা হয়।’

খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনাম হক বলেন, ‘হিমায়িত কুমির ও চামড়া রপ্তানি হলেও কুমিরের মাংস ও দাঁত রপ্তানির অনুমতি মেলেনি এখনো পর্যন্ত। এসবের অনুমতি পেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে কুমিরের খামারটি।’