খেলাটাকে এখনো উপভোগ করছি

গত দেড় দশকে দেশের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার মামুনুল ইসলাম মামুন। বয়স ৩৫। অথচ এখনো খেলাটা চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক উপভোগের মন্ত্র হৃদয়ে বুনে বুটজোড়া তুলে রাখতে চান না সহসা। জাতীয় দল থেকে দূরে থাকলেও লাল-সবুজ ভাবনাটা দূরে রাখতে পারেননি, ভাবনাগুলো বলেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে

সমসাময়িক প্রায় সবাই খেলা ছেড়ে দিয়েছে। আপনি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। রহস্যাটা কী?

মামুন: এখনো উপভোগ করছি বলেই খেলাটা চালিয়ে যাচ্ছি। যেদিন থেকে খেলাটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলব, সেদিন ঠিকই বুটজোড়া তুলে রাখব। আসলে একটা সময় তো থামতে হবেই। তবে যতদিন পর্যন্ত মনে হবে দলকে সার্ভিস দিতে পারব, ততদিন খেলে যাব। আমি আসলে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই কিছু জিনিস মেনে চলেছি। ফিটনেসটা যাতে ভালো থাকে, সেদিকে মনযোগী ছিলাম। বর্তমানে ফর্টিজ ফুটবল ক্লাবে খেলছি। কিছু চোট হয়তো নিয়মিত খেলতে দিচ্ছে না। তবে চেষ্টা করছি দলের সবার সঙ্গে মানিয়ে চলার। আপনি দলের কোচ, কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই জানতে পারবেন এখনো অনুশীলনে আমি কতটা নিবেদিত।

তারপরও তো বয়স একটা ব্যাপার। কতদিন আর খেলা চালিয়ে যেতে পারবেন?

মামুন: বয়সকে পাশ কাটানো সম্ভব নয়। সেটা আমিও মানি। এ বছর একটি ম্যাচ খেলেছি। পেশিতে কিছুটা চোট থাকায় একটু বিশ্রামে আছি। তবে লিগের পরের ম্যাচটা খেলার ইচ্ছে আছে। এই মৌসুমে যদি আরও কিছু ম্যাচ খেলতে পারি, তবে আরও দুটি মৌসুম খেলা চালানোর ইচ্ছে আছে।

তারপর...?

মামুন: খেলা ছাড়লেও ফুটবলকে ছাড়া মনে হয় সম্ভব নয়। আমরা জাতীয় দলের সাবেক ১২ ফুটবলার এএফসির একটি বিশেষ কোচেস কোর্স করছি। একটু ব্যয়সাধ্য হলেও কোর্সটা শেষ করতে পারলে ভবিষ্যতে কোচিং পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে পারব। যেহেতু বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চাকরি করছি, সেহেতু সেখানে যদি কাজের সুযোগ থাকে, করব। এ ছাড়া কখনো যদি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কিংবা কোনো ক্লাব চায়, তবে কাজ করার ইচ্ছে আছে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সব শীর্ষ দলে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন। দীর্ঘদিন জাতীয় দলে কেবল খেলেননি, অধিনায়কত্বও করেছেন। জাতীয় দলের দিনগুলোর স্মৃতি নিশ্চয় এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়?

মামুন: এই স্মৃতি ভোলার নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলে খেলেছি। এরপর থেকে আর সুযোগ হয়নি। বাদ পড়াটা ইতিবাচকভাবেই নিয়েছি। কারণ পুরনোরা সরে না দাঁড়ালে নতুনরা আসবে কীভাবে? তবে একটা জিনিস ভেবে তৃপ্তি পাই যে, মানুষ এখনো আমাকে মনে রেখেছে। এখনো সেই সম্মানটা সব জায়গা থেকে পাই। মানুষ যখন বলে, এখনো মামুনের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়নি, তখন একটা মিশ্র অনুভূতি হয়।

সেটা কেমন?

মামুন: যখন যেখানেই খেলেছি, নিবেদনে কমতি রাখিনি। তাই হয়তো মানুষ এখনো সম্মান করে। এটা অবশ্যই ভালো লাগার। তবে যখন শুনি আমার বিকল্প পাওয়া যায়নি, তখন মনটাও খারাপ হয়। কারণ আমি সবসময় চাই জাতীয় দল ভালো করুক। আমার চেয়েও ভালো মিডফিল্ডার আসুক সেটাই চাই।

জাতীয় দলকে একটা ভালো অবস্থানে দেখতে চান। অথচ এই সুসময়ের দেখা তো অনেক দিন মেলে না।

মামুন: এটা ঠিক আমরা অনেক দিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব ভালো পারফর্ম করতে পারছি না। আসলে আমাদের ফরোয়ার্ড লাইনে দীর্ঘদিন ধরেই একটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এমিলি, এনামুল, মিথুন চৌধুরীর বিদায়ের পর জীবনকে ঘিরে বড় একটা প্রত্যাশা ছিল। ঘরোয়া ফুটবলে সেটা সে পূরণ করলেও জাতীয় দলে পারেনি। সুমন রেজা, মতিন মিয়াদের এখনই আমি এমিলি, এনামুলদের কাতারে রাখব না। তবে ইতিবাচক হলো, জাতীয় দল অনেক দিন পর দুজন ভালোমানের উইঙ্গার পেয়েছে। রাকিব এবং ইব্রাহিম অসাধারণ উইঙ্গার। এখন একজন ভালো ফিনিশার ও একজন পারফেক্ট নাম্বার টেন প্রয়োজন।

লিগে খেলছেন বলেই নিশ্চয় নতুন অনেকের খেলাই দেখছেন। কারও মধ্যে কী পারফেক্ট নাম্বার নাইন ও টেন হওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছেন?

মামুন: আমি মনে করি, যে দলটি সাফ ও এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ খেলেছে, সেই দলের অনেক প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় আছে। তবে আমি মনে করি পারফেক্ট নাম্বার টেন হিসেবে জাতীয় দলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে মোরসালিনকে দেখতে পাব। ও অসাধারণ খেলোয়াড়। আরও এক বছর আগেই জাতীয় দলে ডাক পেতে পারত ও। তবে ওকে নিয়ে তাড়াহুড়ো না হওয়ায় ভালো হয়েছে। নিজেকে আরও পরিণত করেই ও জাতীয় দলে আসুক, দীর্ঘদিন জাতীয় দলকে সার্ভিস দিক, এটাই চাওয়া।

ভালো ফিনিশার নেই, ভালো ডিস্ট্রিবিউটরেরও সংকট আছে। ভালোমানের খেলোয়াড় কেন বেরিয়ে আসছে না?

মামুন: এটা আসলে সংগঠকরাই ভালো বলতে পারবে। একজন খেলোয়াড় হিসেবে যতটুকু বুঝি, জেলা লিগগুলো নিয়মিত না হওয়ায় একটা খেলোয়াড় সংকট তৈরি হয়েছে। কয়টা জেলায় ঠিক ঠিক লিগ হয়, বলুন তো? জেলায় যদি সঠিক নিয়মে লিগ না হয়, ভালো খেলোয়াড় উঠে আসবে না। এক্ষেত্রে আমি চট্টগ্রামকে একটু আলাদা রাখতে চাই। দেখবেন লিগের শীর্ষ দলগুলোতে এখনো অনেক চট্টগ্রামের ফুটবলার খেলছে। তার কারণ লিগটা ভালোভাবে হয়। তা ছাড়া আমাদের ফুটবলারদের অনেক দিনের একটা চাওয়াও সম্প্রতি পূরণ হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগে খেলা চট্টগ্রামের ফুটবলাররা সেই লিগ শেষে চট্টগ্রাম লিগে এখন থেকে খেলতে পারবে। এতে করে লিগটা আরও জমজমাট হবে। নতুনরাও আগ্রহী হয়ে উঠবে।

এটা তো অনেক ভালো উদ্যোগ

মামুন: পেশাদার লিগের ফুটবলারদের আগে একটাই লিগ খেলার সুযোগ থাকত। এখন তারা চট্টগ্রাম লিগে খেলতে পারবে। এটা যদি অন্য জেলাগুলোতেও হয়, তবে আমি মনে করি, তৃণমূলে আবারও একটা জাগরণ ঘটবে।

এ বছর সাফ ফুটবল হবে জুনে। আপনি তো ছয়টা সাফ খেলেছেন। তবে দুর্ভাগ্য, একবারও দল খুব ভালো কিছু করতে পারেনি। এবার আপনার প্রত্যাশা কী?

মামুন: সাফে আমরা সবসময় চাই একটা সম্মাজনক ফল পেতে। তবে সেটা করতে হলে একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। আমাদের দেশে যেহেতু শিক্ষিত খেলোয়াড় কম, সেহেতু একটি নির্দিষ্ট স্টাইলে আমাদের খেলতে হবে। অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২৩ ও জাতীয় দলের খেলার ধরন হতে হবে এক রকম। তবেই দেখবেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

আর র‌্যাংকিং নিয়ে কী বলবেন? আপনারা একটা প্রজন্ম কেবল র‌্যাংকিংয়ে অবনতিই দেখে গেলেন।

মামুন: শুরুর দিকে কিন্তু র‌্যাংকিং অতটা খারাপ ছিল না। আমাদের র‌্যাংকিংয়ের অধঃপতনের শুরু ২০১৬ সালে ভুটানের কাছে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে হারার মধ্য দিয়ে। সেই হারের কারণে আমরা প্রায় দেড়-দুই বছর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নির্বাসনে চলে যাই। এরপর করোনার কারণেও দীর্ঘদিন খেলা হয়নি। যে কারণে আমরা র‌্যাংকিংয়ে পতন হতে থাকে। র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি করতে হলে আমাদের একটা সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। দেখতে হবে, কোন ম্যাচগুলো খেললে আমাদের র‌্যাংকিংয়ের উন্নতির সুযোগ থাকবে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো করতে হলে আমাদের তৃণমূলে নজর দিতে হবে। জেলা লিগগুলো হতে হবে সঠিকভাবে। তবেই আমাদের অপ্রাপ্তিগুলো ঘুচে যাবে।