মেশিন নয় সমস্যা ভোটকেন্দ্র

ব্যবস্থাপনায় ড. তোফায়েল আহমেদ। স্থানীয় শাসন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে কুমিল্লা ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আগে শিক্ষকতা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। নির্বাচন কমিশন, ইভিএম মেশিন এবং রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবিত দুই লাখ নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনার প্রকল্প স্থগিত হওয়ার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

ড. তোফায়েল আহমেদ : কেন স্থগিত হয়েছে, তার কারণটা দেখতে হবে। কারণটা আমাদের কাছে পরিষ্কার জানা নেই।

দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে তো অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে বাড়তি খরচ কমাতে, কৃচ্ছ্র সাধনের কথা।

ড. তোফায়েল আহমেদ : সেটা ঠিক আছে। এটা ইমিডিয়েট রিজন। যেটা সবাই দেখছে যে, এই পরিস্থিতিতে বাড়তি টাকা জোগাড় করা সরকারের জন্য কঠিন। কিন্তু সরকার যখন ইভিএম কেনার কথা বলছিল, তখনো কিন্তু দেশে টাকার সংকট ছিল। কিন্তু তারা ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট হবে, মেশিন কেনা হবে এমন কথাই বলে আসছিল। প্রথম কথা হচ্ছে- এখন ইমিডিয়েট রিজন যেটা বলছে যে টাকার অভাব সেটা হতে পারে। তবে, আরেকটা হতে পারে যে সরকার হয়তো কৌশলগতভাবে পিছু হটেছে, যেহেতু সবাই এটা চাচ্ছে না। ইভিএমের বিষয়ে ঐকমত্য  নেই। কারণ এটার জন্য আবার নির্বাচনে না যাওয়ার মতো রিজন দাঁড় করানো হতে পারে। সুতরাং এক্ষেত্রে সরকার হয়তো কৌশলগতভাবে পিছিয়েছে। আর তৃতীয়ত, ম্যানেজমেন্ট প্রবলেম। কারণ, শুধু টাকা দিলেই তো হবে না। এই যন্ত্রগুলো আনা, সেগুলো ঠিকঠাক করা এবং এম মধ্যে এসব নির্বাচনের জন্য রেডি করা...। এসবে তো অনেক ঝক্কি আছে। সেটা সরকার নিতে চাচ্ছে কি না বা নির্বাচন কমিশনও এটা নিয়ে কতটুকু এগ্রিড, কারণ, পুরো নির্বাচন কমিশনই যে এটাই চাচ্ছিল তা মনে হয়নি। বিশেষ করে সিইসির কথায় এমন মনে হচ্ছিল। সবকিছু মিলিয়ে সময় বলে দেবে এটা কৌশলগত কারণেও হতে পারে আবার ইমিডিয়েট রিজন অর্থের অভাবেও হতে পারে।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু আগামী সংসদ নির্বাচনে সবগুলো আসনেই ইভিএম মেশিন ব্যবহারে বিভিন্ন বিরোধিতা থাকার পরও একরকম একরোখা মনোভাব দেখানো হচ্ছিল। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ, তবে সিইসি তো সম্ভব হবে না এমন কথাও বলেছেন। কারণ হচ্ছে কি, সরকারের মনোভাবটাই সিইসির মনোভাব। সরকার যেহেতু শক্তভাবে বলেছিল ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট হবে, সেজন্যই ইসিও তখন অন্য কথা ভাবতে চায়নি বা গ্রহণ করতে চায়নি। এখন সরকার তাদের না জানিয়েই এটা স্থগিত করেছে। কারণ তারা তো প্রস্তাব দিয়েছিলই। সরকার ইভিএমের পক্ষে দেখেই তারাও দৃঢ় মত দেখিয়েছে এবং প্রস্তাবও দিয়েছে। সরকারের বাইরে নির্বাচন কমিশনের শক্ত কোনো মতামত আছে এটা মনে করার কোনোই কারণ  নেই।

দেশ রূপান্তর : নতুন মেশিন কেনার প্রস্তাব স্থগিত ঘোষণার পর সিইসি বলছেন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট হবে। এতে কি কোন আসনে ইভিএমে আর কোন আসনে ব্যালটে ভোট হবে তা নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হবে না?

ড. তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ, এটা নিয়ে একটা নতুন বিতর্ক তৈরি হবে। কারণ বিরোধীদের অনেকেই চাইবে না যে তার আসনে ইভিএমে ভোট হোক। আবার সরকারি দলের কেউ চাইতে পারে যে হোক। বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি তারা তো ইভিএমকে না বলেই দিয়েছে। অন্যরাও একই কথা বলবে হয়তো। তবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্যরকম মনে করি  ইভিএমকে, মানে প্রযুক্তিকে টোটালি না করাটা একটা খারাপ বার্তা দেয়। কম্প্রোমাইজড ফর্মুলার যে প্রস্তাবটা আসছিল, তারা সে কাজটা করেনি। এখনে প্রযুক্তিকে ভিলেন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানে, প্রযুক্তির যে ত্রুটিগুলো আছে, ধরেন, এই যে পেপার ট্রেইল নেই, তারপর আঙুলের ছাপ না মেলা, ভোটদানের মেশিনে দেরি হওয়া প্রভৃতি শুধরে নেওয়ার দরকার ছিল। সেগুলো তারা করেনি। বরং তারা আরও দুই লাখ ইভিএম কেনার প্রস্তাব দিয়ে দিয়েছিল। তো এসব খুব একটা ভালো দৃষ্টিভঙ্গি না আর কি।

দেশ রূপান্তর : হ্যাঁ, ইভিএমে ভোটারকে পেপার ট্রেইল দেওয়ার ব্যাপারটি তো নাগরিক সমাজেরও কেউ কেউ বলেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে ইসি কোনো কথাই বলেনি।

ড. তোফায়েল আহমেদ : এটা নিয়ে কোনো বক্তব্যই পাওয়া যায় না ইসির। কিন্তু মেশিন কেনায় তাদের অনেক আগ্রহ। কিন্তু এসব মেশিন গুদামে মেইনটেন্যান্স ছাড়া পড়ে থেকে নষ্ট হলে তার দায় কে নেবে? আগের কেনা অনেকগুলো মেশিন যে এখন কাজ করছে না, তার দায় তো কেউ নিল না। আবার নতুন মেশিন কেনা হলে সেগুলো যে ওয়ার্কেবল থাকবে তার তো কোনো গ্যারান্টি নেই। তাছাড়া আবার ত্রুটিপূর্ণ মেশিন আমি কেন কিনব? তাছাড়া মেশিনের দামের প্রশ্নেও অনেকের দ্বিমত আছে। যে দামে এটা কিনছি, সেটাই এই মেশিনের আসল দাম কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে অনেকগুলো কন্ট্রাভার্সি রয়ে গিয়েছে। এটার ইভাল্যুয়েশনগুলো হয়নি। মানে আগে যে মেশিনগুলো কিনেছি এবং সেগুলোর যে কার্যক্ষমতা সেটার ইভাল্যুয়েশন করে তার ভিত্তিতে যে আমরা নতুন জায়গায় যাব সে পরিস্থিতি তো তৈরি করা হয়নি।

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি ইভিএমে ভোটগ্রহণকালে কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরায় দেখা গেল যে ভোটবুথে আগে থেকে অবস্থান করা বহিরাগত ভোট দিয়ে দিচ্ছে। ঢাকা থেকে এ দৃশ্য দেখে ভোটও বাতিল করা হয়েছিল। তো ভোটকেন্দ্র কি সিসি ক্যামেরা রাখা উচিত?

ড. তোফায়েল আহমেদ : আপনার দেশে যেহেতু মানুষ এভাবে ভোট সেন্টারে অনুপ্রবেশ করে ভোট দিয়ে দিচ্ছে এমন ইতিহাস আছে, সেহেতু এসব শনাক্তের জন্য অবস্থা বিবেচনায় সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের দরকার আছে। এখানে অনেক ক্ষেত্রে ইভিএম মেশিন নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে তার বেশিরভাগ প্রশ্নই কিন্তু মেশিনের এফিশিয়েন্সি নিয়ে না। মেশিনের দক্ষতা নিয়ে না। এটা হচ্ছে ভোটকেন্দ্রের ম্যানেজমেন্টের সমস্যা। ভোটকেন্দ্রে মেশিনে ভোটার শনাক্ত হওয়ার পরে অবাঞ্ছিত মানুষ ঢুকে তারা বাটন টিপে দিচ্ছে অথবা ভোটারকে নির্দেশ দিচ্ছে যে এখানে ভোট দাও। এগুলো তো গুরুতর অপরাধ। এখানে মেশিনের প্রশ্নের চেয়ে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে, রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই প্রশ্ন কেন কাজ করছে না যে ভোটকেন্দ্রে তো অবাঞ্ছিত কেউ ঢুকতে পারবে না। এটাকে উৎসাহ না দেওয়া বা এটার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কোনো ঐকমত্য দেখা যায় না। বিশেষ করে রুলিং পার্টির মধ্যে। অপজিশন এবং অন্যদের ভয়টা তো এখানে। প্রশাসন, পুলিশ এবং দলীয় কর্মীরা একসঙ্গে হয়ে যখন রিগিং করে তখন মেশিন কিংবা নো মেশিন কোনো কিছুই কাজে আসছে না। এগুলো সবই মিস ম্যানেজমেন্ট। অনিয়ম করেই করা হচ্ছে। এবং জানাশোনার মধ্যে, ইচ্ছেকৃতভাবেই এসব হচ্ছে। প্রবলেম তো ওখানে, মেশিনে তো এত প্রবলেম দেখি না। প্রথম সমস্যা হচ্ছে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায়, ম্যানেজমেন্টে।

দেশ রূপান্তর : এটা কি কেবল ইসির ওপর নির্ভর করে? রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা সংস্কৃতির ভূমিকা কতটা?

ড. তোফায়েল আহমেদ : রাজনৈতিক সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে হবে না। প্রশাসন কেন এমন করবে, পুলিশ কেন এর সঙ্গে যুক্ত হবে? আর ইসি-ইবা কেন চোখ বন্ধ করে থাকবে? রাজনৈতিক দল এটা করতে চাইবে। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট যখন ঠিক থাকবে তখন তারা এটা করতে পারবে না। একটা ভোট বাতিল হয়ে গেল না? এই জাতীয় জিনিস, দৃষ্টান্তগুলো তাদের ইন্সট্যান্ট ক্রিয়েট করতে হবে তো। কিন্তু আপনি যদি বলেন, আমি দেখিনি, আমাকে কেউ অভিযোগ করেনি এটা তো কোনো কথা না। তার মানে আপনি সব জানেন এবং আপনি এটা অ্যালাউ করেছেন। সমস্যাটা এখানেই। 

দেশ রূপান্তর : বলা হয়ে থাকে বা আইন অনুযায়ী তো নির্বাচনকালীন প্রশাসন ইসির হাতে...

ড. তোফায়েল আহমেদ : এগুলো তো সব কথার কথা হিসেবে বলা আছে। হাতে থাকলে তাদের কথা শোনে না কেন?

দেশ রূপান্তর : ইসির তো সেই দৃঢ়তা দেখাতে হবে।

ড. তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ, কিন্তু তারা যখন ইসির কথা শুনল না তখন কমিশন কী করেছে? এই যে গাইবান্ধার ইলেকশনে ইসির যে ফাইন্ডিংস, তার সঙ্গে সরকারের মানে প্রশাসনের যে ফাইন্ডিংস, তার মধ্যে তো বিরাট পার্থক্য। এখানে কোনো অ্যাকশন হয়েছে? হয়নি তো। যদি অ্যাকশন হতো, তাহলে শুধু নির্বাচন বাতিল করে দিলেই তো সব হবে না। বাতিলের পর কী কারণে এটা বাতিল হলো, কারা রেসপন্সিবল সেটা ফিক্সড করতে হবে। দায়িত্ব কার ছিল আর কে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে সেটা বের করে উপযুক্ত শাস্তির বন্দোবস্ত করতে হবে তো। এটা হলে আর ওই ঘটনার রিপিট হবে না।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি ভঙ্গে শাস্তির নজির তো মনে পড়ে না।

ড. তোফায়েল আহমেদ : আচরণবিধিটা ধরেন কেবল প্রার্থীর জন্য। কিন্তু নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে কেউ, সেক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যারা ছিল, ভোট কাস্টিংয়ের দায়িত্বে যারা ছিল, ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব যাদের ছিল তারা তাহলে ফেইল করেছে। তারা দায়িত্বে থাকলে ভোটকেন্দ্রে অবাঞ্ছিত লোক কীভাবে ঢোকে! সিসি ক্যামেরায় কীভাবে শনাক্ত হলো? সিসি ক্যামেরায় যারা শনাক্ত হলো, তাদের কি কেউ অ্যারেস্ট করেছে? শাস্তি দেওয়া হয়েছে? যাদের দায়িত্বে অবহেলায় অবাঞ্ছিত লোক ঢুকল, তাদের কোনো শাস্তি হয়েছে? এটার ফাইন্ডআউট করা হয়নি। এসব হচ্ছে, এ কারণেই হচ্ছে। এবং এটা জেনেবুঝেই করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : নতুন ইভিএম কেনা বাতিল, বিরোধীদের সভা-সমাবেশে অপেক্ষাকৃত নমনীয়তা দেখানোর মধ্য দিয়ে কি বিরোধীদের নির্বাচনে আসার আস্থা তৈরি করা হচ্ছে?

ড. তোফায়েল আহমেদ : আপনার প্রশ্নের সঙ্গে আমি একমত না। আপনি কে যে আপনি ছাড় দেবেন, নমনীয়তা দেখাবেন? ধরে রাখবেন, আবার ছাড়বেন, এগুলো কী? এগুলো কি জাতির সঙ্গে তামাশা? মিটিং, মিছিল করার রাইট আছে, করবে। আপনি ছাড় দেওয়ার বা না দেওয়ার কে? এসব বেশিদিন রাখা যায় না। আমি না মানলে আপনি কী করবেন, আমি মিছিল করব। হ্যাঁ, আপনি হয়তো অ্যারেস্ট করবেন। কিন্তু এসব দেশকে একটা সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়। একটা দল যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা যখন কতগুলো দাবি করছে এটা র‌্যাশনালি নিতে হবে। তাদের সব দাবি মানতে হবে তা না। সব দাবি কোনো সময়ই মানা হয় না। কিন্তু একটা মাঝামাঝি অবস্থায় আসতে হবে। অন্যদিকে, তারাও কালকেই সরকারকে ফেলে দিতে হবে, পদত্যাগ করতে হবেএরকম বলছে, যা ঠিক না। আবার সরকার বলছে যে সংবিধানে যা আছে তাই-ই হবে, এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সেটাও ঠিক না। দুই পক্ষকেই ছাড় দিয়ে একটা জায়গায় আসতে হবে। সমাজটাকে, গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য এক জায়গায় আসতে হবে। কোনো কম্প্রোমাইজ হবে না, এমন একরোখা মনোভাব, এটা একদমই ঠিক না, সম্ভব না।