নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি কঠোর পরিশ্রম ও শেখার ফল।’ রোমান্টিক ধারার অন্যতম প্রধান ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলি বলেছেন, ‘আমরা যতই অধ্যয়ন করি ততই আমাদের অজ্ঞানতাকে আবিষ্কার করি।’ আর যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান কবি ও গ্রামীণ জীবনের বাস্তবসম্মত ভাষ্যকার রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, ‘আমি শিক্ষক নই, আমি একজন জাগরণকারী’। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট এই উক্তিগুলো এবার এসএসসির ফল বিপর্যয়ে সামনে চলে এসেছে। ১১ আগস্ট দেশ রূপান্তর ও সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলোতে ফল বিপর্যয়ে বহুমাত্রিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিবর্ণতার পেছনে শিখন পদ্ধতি, শিক্ষার্থী নাকি শিক্ষাব্যবস্থার খামতি রয়েছে। পাসের হারই শুধু অধঃমুখী নয়, শিক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অনেক বিষয় এবার দৃশ্যমান হয়ে জিজ্ঞাসার সারি দীর্ঘ করেছে। ১৯ বছরের মধ্যে এসএসসির ফলে যে অভিঘাত লেগেছে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব পক্ষকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়ার গভীর তাগিদ দিয়েছে বলেও আমরা মনে করি।
শিক্ষার্থীদের কার্যকরভাবে শিক্ষা অর্জনে সহায়তার জন্য শিক্ষকদের ব্যবহৃত সুনির্দিষ্ট নীতি, কৌশল, কর্ম এবং পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তাশক্তি ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়গুলো আলোচনায় নতুন নয়। এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫। জিপিএ ফাইভের হারও নিম্নমুখী। নয়টি সাধারণ বোর্ডে বিজ্ঞানে পাস ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ আর মানবিক বিভাগে ৪৮ দশমিক ৭৪। এবার দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি! গতবার এ সংখ্যা ছিল ১৩৪। এক বছরে ব্যবধানে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির সংখ্যা ১৭৮। একদিকে দেশে বাড়ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান! ২০২১ সালে যে সংখ্যা ছিল ১৮, ৮ বছরের ব্যবধানে সেই হার কতগুণ বেড়েছে? প্রশ্নটি যেমন অপ্রীতিকর, এর উত্তর আরও বেশি অপ্রীতিকর। ২০২৪ সালে দেশের ২ হাজার ৯৬৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করে। এক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পরিসর বাড়ছে। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইংরেজি আর গণিতে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী ফেল করায় সামগ্রিক পাসের হার কমেছে। যদি তা-ই হয় তাহলে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা কেন এত দুর্বল এবং এর প্রেক্ষাপট কী, এর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ও বর্তায় তাদের ওপরই।
শিক্ষা নিয়ে ইউনিসেফের তথ্য আমাদের আরও উৎকণ্ঠিত করে। ইউনিসেফ বলছে, ৬০ শতাংশ শিশু মৌলিক গণিত দক্ষতাতেই পৌঁছাতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যারা বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়ছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন তাদের এ গল্প এই জিজ্ঞাসারও জন্ম দেয়, সুফল সেক্ষেত্রে কতটা দৃশ্যমান? দেশে এমন বিদ্যালয়ও আছে, যেখানে শিক্ষার্থী ১০-১২ জন এবং শিক্ষকও সমসংখ্যক এবং এরই সমান অকৃতকাজ ও ব্যর্থতার খতিয়ান! শিক্ষা বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেকেরই এও ভাষ্য, কঠোর মূল্যায়ন হয়েছে তাই পাসের হার কমেছে। আমরা নিশ্চয় এর বিপক্ষে নই বরং আমরাও চাই ন্যায্য মূল্যায়ন হোক। অতীতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা এমন কথা শুনেছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কঠোর মূল্যায়নও কেন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলে ঔজ্জ্বল্য বাড়াচ্ছে না! ব্যর্থ কে, কেন ব্যর্থ, গলদ কোথায়? আমরা মনে করি, এই বিষয়গুলোর গভীর অনুসন্ধানের সময় বয়ে যাচ্ছে। অনেক এমপিও, নন-এমপিও বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল, অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের একাডেমিক তদারকি ছাড়াই চলছে, এই অভিযোগেরও অনুসন্ধানক্রমে প্রতিবিধান জরুরি। এবার কোনো কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে কঠিন প্রতিকূলতার মুখে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়েছে, তা অসত্য নয়, কিন্তু এর বিরূপ প্রভাব তো সামগ্রিক হয়ে উঠার অবকাশ নেই। আমরা মনে করি, শিক্ষক সংকটের নিরসন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি, শেখার খামতি পূরণের পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাগুলোর নিরসনে মনোযোগ দেওয়া দরকার। অস্থিতিশীল পরিবেশ, মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানÑ এই বিষয়গুলো উদাসীনতার ছায়ায় ঢেকে রেখে ‘কঠিন মূল্যায়ন’ আর আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো উত্থাপনের মধ্য দিয়ে কি সংকট নিরসনের পথ বের করা সম্ভব?