টাকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের সংগঠনে টানছে হুজি

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের টাকা দিয়ে সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদ (হুজি)। ইতিমধ্যে অনেকে হুজিতে যোগ দিয়েছে। পাহাড়ে প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলার পরিকল্পাও নিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল দেশে বড় ধরনের নাশকতার মাধ্যমে নতুন করে হরকাতুল জিহাদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া। জঙ্গি গোষ্ঠীটির ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানতে পেরেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানায় সিটিটিসি।

গত শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে হরকাতুল জিহাদের সদস্য ফখরুল ইসলামসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসির ডিজিটাল ফরেনসিক টিম। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন ফখরুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম, মো. সুরুজ্জামান, হাফেজ মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. দীন ইসলাম ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত ৯টি মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (সিটিটিসি) মো. আসাদুজ্জামান।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ফখরুল ইসলাম আফগানিস্তানের কান্দাহার শহরে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমরের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ২০০৫ সালে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে ফের সক্রিয় হন হরকাতুল জিহাদকে সংগঠিত করতে। ২০১৭ সাল থেকে চেষ্টা চালাচ্ছেন রোহিঙ্গাদের সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার।

অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, ফখরুল ১৯৮৮ সালে গাজীপুরের টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় দারোয়ানের চাকরি করতেন। একই বছর কাজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের করাচি শহরে যান। তিনি পাকিস্তানে অবস্থানকালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুফতি জাকির হোসেনের সঙ্গে পরিচয় হয়। মুফতি জাকির পাকিস্তানের করাচি শহরে ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও আল-কায়েদার সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি জিহাদের দাওয়াত দিলে ফখরুল রাজি হন। এরপর জিহাদি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য মুফতি জাকিরের সঙ্গে একাধিকবার পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে যান ফখরুল। সেখানে কান্দাহার শহরে দীর্ঘকালীন প্রশিক্ষণ নেন। ফখরুল বিভিন্ন অস্ত্র প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭, এলএমজি ও রকেট লঞ্চার চালাতে শেখেন। এ সময় কান্দাহারের শমসেদ পাহাড়ে তিনি নিয়মিত ফায়ারিং অনুশীলন করতেন। অনুশীলনের সময় ফখরুল ইসলাম একে-৪৭-সহ সশস্ত্র অবস্থায় প্রশিক্ষণ এলাকায় চার ঘণ্টা করে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতেন। এ সময়ে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমরের সাক্ষাৎ পান তিনি। ফখরুল পুনরায় পাকিস্তানের করাচিতে ফিরে আসেন। সেখান থেকে ১৯৯৫ সালে ইরানের রাজধানী তেহরান যান এবং প্রায় তিন বছর সেখানে থাকার পর করাচিতে ফিরে আসেন। ফখরুল পরে ইসলামাবাদ থেকে ভারতের ভিসা নিয়ে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে চলে আসেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, সিটিটিসির জঙ্গি কার্যক্রমবিরোধী অপারেশন চলমান থাকায় এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের মুফতি হান্নানসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ায় জঙ্গি সংগঠনটি নেতৃত্বশূন্য হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে এসে ফখরুল জঙ্গি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নতুন সদস্য সংগ্রহ ও হরকাতুল জিহাদের সদস্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযাগমাধ্যমও ব্যবহার করেন। যেকোনো সময় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা চালানোর বিষয়ে নিজেদের মধ্যে পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশের হুজি সদস্যদের বান্দরবানে পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করে। ফখরুল ও তার ছেলে গ্রেপ্তার হওয়া সাইফুল ইসলাম অন্যদের নিয়ে একাধিকবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। রোহিঙ্গাদের দলে ভেড়ানোর উদ্দেশ্যে এবং জঙ্গি কার্যক্রমের অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করতে মোটা অঙ্কের টাকা অনুদান দেন।

সিটিটিসিপ্রধান বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে হাফেজ আবদুল্লাহ আল মামুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার হওয়া টেলিগ্রাম গ্রুপ ‘মোরা সত্যের সৈনিক’-এর অ্যাডমিন। তিনি অস্থায়ী মুসাফির ছদ্মনামে গ্রুপটি পরিচালনা করেন। এ ছাড়াও আবদুল্লাহ আল মামুন গ্রুপের মাধ্যমে প্রবাসীদের এবং বাংলাদেশের অন্যান্য হরকাতুল জিহাদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা ও বার্তা আদান-প্রদান করেন। হুজির একটি এনক্রিপটেড অ্যাপে প্রাইভেট চ্যানেল ‘একটু প্রস্তুতির’ কনটেন্ট হিসেবে ‘একটি বোমা তৈরি করো তোমার মায়ের রান্নার ঘরে’ শীর্ষক ১০ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এবং একই চ্যানেল থেকে টাইম বোমা বানানোর বাংলা বিবরণসহ ভিডিও শেয়ার করে। আবদুল্লাহ আল মামুন এনক্রিপটেড অ্যাপের চ্যানেল থেকে পাওয়া কনটেন্ট সংগঠনের পরিচিত দুই-একজনকে হাতে-কলমে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ লাভের উদ্দেশ্যে ও বোমা বানানোর নির্দেশনা দিয়ে শেয়ার করেছেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, তারা টেলিগ্রাম গ্রুপে সক্রিয় থেকে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, তারা গ্রুপে উগ্রবাদী ও আক্রমণাত্মক প্রশিক্ষণের বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি সচিত্র প্রশিক্ষণের ডকুমেন্টস আদান-প্রদান করত।